ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং কৃষকের অবস্থা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩১
সরকার ডিজেলের মূল্য নির্ধারণ করেছেন লিটার প্রতি ৬৮ টাকা। দাম বাড়ার হার ৫৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে গত ৪-১-২০১৩ তারিখে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ৯২.৮৫ ডলার। যা গত বছর ছিল ১২০ ডলার। সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করলেও বিজ্ঞ মহলের ধারণা আগামী বছর প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০৭ ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দেখা যাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও এ খাতে ভর্তুকি কমানোর অজুহাতে তেলের দাম বাড়ছে। এই ভর্তুকি কমানোর দায় যারা বহন করছে সরকার কি তাদের কথা ভেবে দেখেছেন বা তাদের আর্থিক সঙ্গতির দিকে খেয়াল রাখছেন? দেশের প্রান্তিক কৃষককে ডিজেলের দাম বাড়ানোর জন্য চরম আর্থিক খেসারত দিতে হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান অপরিসীম। অথচ কৃষি উত্পাদনের জন্য ব্যবহূত উপকরণের দাম বাড়ানোর ফলে দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এই কৃষকেরাই দেশের সামগ্রিক মূল্য স্ফীতির লাগাম টেনে নিম্নমুখী রাখছে তাদের কৃষিক্ষেত্রের উত্পাদিত পণ্য দিয়ে। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্য স্ফীতির হার ছিল ১০.৪৩ শতাংশ আর এই মূল্য স্ফীতি কমে ডিসেম্বর মাসে এসে হয়েছে ৭.১৪ শতাংশ। এই মূল্য স্ফীতি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের মূল্য হ্রাস পাওয়ার ফলে সামগ্রিক মূল্য স্ফীতিতে প্রভাব পড়েছে। মূল্য হ্রাস পাওয়ার খাদ্যপণ্যের তালিকায় রয়েছে ধান, চাল, বিভিন্ন ধরনের তরিতরকারি যা কৃষক উত্পাদন করে। আর দাম বাড়ার খাদ্য পণ্যের তালিকায় রয়েছে সোয়াবিন তেল, আমদানিকৃত ডাল, চিনি, চা, বিস্কুট। কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের মূল্য কমে যাওয়ার পাল্লা ভারী হওয়ায় সকল খাদ্যপণ্যের মূল্য গড়ে কমেছে আর এর প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে সামগ্রিক মূল্য স্ফীতি কমেছে। দেশের সকল মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সামগ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এখনও নিম্ন আয়ের একজন মানুষ তার প্রতিদিনের চাহিদা পূরণ করতে পারছে একমাত্র কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের দাম কম হওয়ার কারণে। গত বছর জানুয়ারি মাসে প্রতিমণ ধানের দাম ছিল ৬০০-৭০০ টাকা আর এবছর এই ধানের দাম কমে মণপ্রতি হয়েছে ৫০০-৫৫০ টাকা। অথচ ধান উত্পাদনে কৃষকের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তারপরও কৃষক তার উত্পাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে জীবন-জীবিকার তাগিদে। দেশের কৃষির সার্বিক প্রেক্ষাপটে যন্ত্রচালিত সেচবিহীন এখন আর ধান চাষ সম্ভব নয়। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত ভূ-পরিস্থ পানি থেকে সেচব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে বৈশ্বিক আবহাওয়াগত পরির্বতনের কারণে। কৃষকের সেচের জন্য এখন গভীর অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুতের সাহায্যে গভীর অগভীর নলকূপ থেকে জমির চাহিদার সময়ানুযায়ী পানি কৃষক সরবরাহ করতে পারে না বলে সেচের জন্য কৃষককে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা গোখাদ্যের অভাবে হালের গরু লালন পালন করতে পারছে না বলে তাদেরকে এখন চাষাবাদের জন্য ভাড়ায় ডিজেলচালিত ট্রাক্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ধান উত্পাদনের জন্য অন্যতম উপকরণ হলো ডিজেল। আর এই ডিজেলের দাম গত চার বছরে বেড়েছে সাতবার আর ধানের দাম চার বছরে কমেছে মণপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা করে। এই পরিস্থিতিতে ডিজেলের দাম বাড়ানো মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো। যখন ডিজেলের দাম ৪৪ টাকা ছিল তখন এক বিঘা জমিতে ধান উত্পাদন করতে খরচ হতো প্রায় ৬২০০ টাকা আর বিঘাপ্রতি ফলন ছিল ১৩-১৬ মণ। বর্তমানে ধানের বাজার মূল্য হিসাবে এক বিঘা জমির ধানের দাম ৭০০০-৮০০০ টাকা। উত্পাদন ব্যয় ও আয় হিসাব করলে লাভের অংক খুবই নগণ্য আর যদি কৃষকের শ্রমের মূল্য ধরা হয় তাহলে লাভ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একজন কৃষক যদি বছরে ১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে তাহলে তাকে বিনিয়োগ করতে হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো। আর এই বিনিয়োগের বিপরীতে কৃষকের লাভ ৭ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো। এখানে কৃষক-শ্রমের মূল্য হিসাব করলে লাভ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১০ বিঘা জমিতে চাষ করার মতো বিনিয়োগ ব্যয় মেটানো নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পর্যায়ের কৃষকের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর ডিজেলের দাম এভাবে ক্রমাগত হারে বাড়তে থাকায় তা গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে গেছে। ফলে এমনি উত্পাদনের দুর্বিষহ ব্যয়ভারের যন্ত্রণা নিয়ে কৃষককে চাষাবাদ করতে হয়। আর এই চাষাবাদের সোনালি ফসল যখন কৃষকের উঠানে মাড়াই হয় তখন কৃষকের হাস্যোজ্বল মুখ তাম্রবর্ণ ধারণ করে বিক্রয়মূল্যে শুনে। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি শুধু কৃষকের উত্পাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না তার প্রভাব পড়বে সমগ্র বিপণন চ্যানেলের ওপর। ডিজেলের দামের সঙ্গে পরিবহন ব্যয় জড়িত। তাই ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় আর পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষক তার উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। বর্তমান কৃষি অর্থনীতির এই উত্পাদনচক্রের সঙ্গে প্রান্তিক আর মধ্যবিত্ত কৃষকেরা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না বলে দেশের সার্বিক কৃষি উত্পাদন প্রক্রিয়াটি চলে যাচ্ছে বড় পুঁজিপতিদের হাতে। দেশের অবস্থাপন্ন লোকেরা প্রান্তিক এবং মধ্যবিত্ত কৃষকের জমি লিজ নিয়ে সমন্বিত খামার গড়ে তোলার মাধ্যমে সবজি চাষ, ধান চাষ, মাছ চাষ করছে। এর ফলে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত কৃষকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছে। আর তারা কাজের আশায় দেশের বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্থিরতার জন্য প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত কৃষকের স্বার্থের কথা ভাবা উচিত। মধ্য ও নিম্ন বিত্তের কৃষক যদি বেকার হয়ে পড়ে তা কিন্তু সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেবে। আসন্ন গরম মৌসুমে উচ্চমূল্যে ভাড়া আনা বিদ্যুেকন্দ্র চালাতে যে বাড়তি তেলের অর্থ লাগাবে তা জোগাড় করতে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। এ ক্ষেত্রে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রে ব্যবহূত তেলের দাম বাড়ানো যেতো। এবারের অর্থবছরে সরকার যে বাজেট পেশ করেছেন তা একটি ঘাটতি বাজেট। কেউ কেউ বলছেন—সরকার এই ঘাটতি পূরণের জন্য জ্বালানি থেকে ভর্তুকি কমানোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এই পদক্ষেপের অংশ হিসাবে ডিজেলের দাম অন্য জ্বালানির চেয়ে বেশি বেড়েছে। কারণ ডিজেলের ব্যবহার অন্য জ্বালানির চেয়ে পরিমাণে বেশি তাই এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সাশ্রয় হবে। এই অর্থ সাশ্রয়ের পদক্ষেপে দেশের এক কোটি ৭৬ লাখ ৮০৪টি কৃষক পরিবারের ওপর যে উত্পাদনের ব্যয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে করে এই পরিবারগুলো কৃষি উত্পাদন প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করবে। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে অস্বাভাবিকভাবে। রাজশাহী