রংপুরকে বিভাগ করার দাবি ছিল বহুদিনের। বিলম্বে হলেও তা পূরণ হয়েছে। আশঙ্কা ছিল সিটি কর্পোরেশন নিয়ে, অবশেষে তাও হয়েছে। মানুষ আশাবাদী সিটিবাসীর সকল নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত হবে। কিন্তু রংপুর বিভাগের অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন, তার বাস্তবায়ন কতদূরে? প্রশ্ন উঠেছে—মন্ত্রীপরিষদে সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও শ্রম আদালতের সার্কিট কোর্ট রংপুরে স্থাপন না হয়ে, বগুড়ায় স্থানান্তর করার ঘটনা নিয়ে। যতদূর জানি এরশাদ সরকারের শাসনামলে রংপুরে শ্রম আদালতের একটি সার্কিট কোর্ট স্থাপন উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কোর্টের উপযুক্ত ভবনের অভাব আর প্রশাসনিক জটিলতায় সেই সার্কিট কোর্ট রংপুরে আসেনি।
সাবেক রাজশাহী বিভাগের বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর জেলা নানা কারণেই উন্নয়ন বঞ্চিত। এই অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারায় শামিল করা, কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি এসব ক্ষেত্রে আছে মানুষের হতাশা। এক হিসেবে জানা গেছে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে নিবন্ধনকৃত প্রায় ১৭০০ ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রংপুর বিভাগে। বড়-মাঝারি প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা এসব ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিস বা শ্রম আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের রাজশাহী যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সময়মতো শ্রম দপ্তরের কাজ বা আদালত ধরতে আগের দিনে রাজশাহী গিয়ে হোটেলে অবস্থান করা, পরদিন কাজ সেরে এর জন্য রাহা ও খাইখরচ আর উকিল-মোক্তারের ফি দিয়ে, পুনরাগমনের পর ওই শ্রমিক বা ট্রেড ইউনিয়ন নেতা পুনরায় খরচের চিন্তা করে বিরোধীয় বিষয়ে রাজশাহী যেতে আর উত্সাহিত হয় না। এসব কারণে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কাঠামোয় দ্বি-পাক্ষিক বা ত্রি-পাক্ষিক আলোচনা এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আদালতে যেতে না পেরে বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় খুঁজতে শক্তির মহড়া কিংবা বিনা নোটিশে ধর্মঘটে যাওয়াটাই অনেকের কাছে এখন আসল পন্থা।
রংপুর বিভাগ ঘোষণা হওয়ার কিছুকাল পরেই মন্ত্রী পরিষদের এক সিদ্ধান্তে রাজশাহী শ্রম আদালতের আওতায়, রংপুরে শ্রম আদালতের একটি সার্কিট কোর্ট স্থাপন করার সিদ্ধান্ত হয়। এক পত্র দ্বারা জেলা প্রশাসককে শ্রম আদালতের উপযোগী একটি বিল্ডিং বা ভবন নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়কে তা জানাতে বলা হলেও আদালতের জন্য বিল্ডিং বা ভবন না পাওয়ায়, শেষমেষ শ্রম আদালতের ওই সার্কিট কোর্ট বগুড়ায় স্থানান্তরিত হয়। এ ব্যাপারে একজন শ্রম কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রংপুরে শ্রম আদালতের সার্কিট কোর্ট করার মতো স্থান না পাওয়ায় উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে তা বগুড়ায় স্থানান্তর করা হয়েছে। কী আশ্চর্য! বগুড়া রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এবং রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ শ্রম আদালত বিদ্যমান। এক বিভাগেই একটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি সার্কিট কোর্ট অথচ রংপুর বিভাগ এক্ষেত্রে অবহেলার শিকার। আমার ধারণা ঊর্ধ্বতন শ্রম কর্তৃপক্ষ এই বিভাগের অসহায় শ্রমজীবীদের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি নিবিড় মনোযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন। তা না হলে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফল ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরও শ্রম আদালতের সার্কিট কোর্ট সরিয়ে নেয়া হলো কেন? এর ফল এই অঞ্চলের শ্রমজীবীদের জন্য হয়েছে ক্ষতিকর।
দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। কাজের পরিবেশ, উপযুক্ত মজুরি, বেতনভাতা নিয়ে এখন কমবেশি সকলেই সোচ্চার। এসব ক্ষেত্রে শ্রম সেক্টরের সেবা সংস্থার দ্বারা সেবাপ্রাপ্তি, শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দিয়ে অসত্ শ্রম চর্চা নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্বল্প ব্যয়ে আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য চাই বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন রংপুরে পূর্ণাঙ্গ শ্রম আদালত, শ্রম পরিদপ্তরের যুগ্ম শ্রম পরিচালক ও কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের উপ-প্রধান পরিদর্শকের বিভাগীয় কার্যালয়।
রংপুর
