আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নের চিঠি বিতরন শুরু করেছে বিএনপি। গতকাল সোমবার বেলা সোয়া তিনটায় দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মনোনয়নপত্র দিয়ে বিতরণের আনুষ্ঠানিতা শুরু হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেগম জিয়ার (বগুড়া-৬ আসন) মনোনয়নের চিঠি তুলে দেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও (বগুড়া-৭) চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর হাতে। পরে বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রার্থীদের মধ্যে চিঠি বিতরণ করা হয়। আজ ঢাকাসহ অন্য বিভাগগুলোর মনোনয়নের চিঠি বিতরন সম্পন্ন হবে। তিনশ নির্বাচনী আসনের মধ্যে অর্ধশতাধিক আসন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জন্য রেখে বাকিগুলোতে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে।
বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে গত ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির যেসব প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছিলেন আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাদেরকেই প্রার্থী করা হয়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্ত বিএনপির বেশ কিছু সাবেক এমপি এবং নেতা বিগত সময়ে মারা গেছেন। এমন প্রায় ২৫ জন নেতার আসনে এবার নতুন মুখকে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি। এরমধ্যে কিছু আসনে মৃত্যুবরণকারী নেতাদের স্ত্রী ও সন্তান, কিছু দলীয় নেতা এবং কিছু জোটের নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোন কোন নেতা বয়োবৃদ্ধ হয়ে চলত্শক্তিহীন হয়ে পড়েছেন বা মামলায় দণ্ডিত অথবা দুদকের জটিলতার কারণে মনোনয়ন পাননি। তাদের স্থানে অন্তত অর্ধশত আসনে নতুন মুখ মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
গত নির্বাচনের প্রার্থীদেরকেই মনোনয়ন দেওয়াই দলের তরুনদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রাতে গুলশান অফিসের সামনে বিক্ষোভও হয়েছে। এই বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলছেন, বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে তারা নবম সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদেরকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি জেলে যাওয়ার আগেই শতাধিক আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে যান। তার নির্দেশেই সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে নিয়ে তাদেরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অনেক আসনে পুরানোদের চেয়ে যোগ্য জনপ্রিয় প্রার্থী থাকলেও তাদের মনোনয়ন না দিয়ে আগের ২০০৮ সালের তালিকা ধরে প্রার্থী করা হয়েছে। এমনকি অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হয় এমন বয়স্ক বেশ কয়েকজন নেতাকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
প্রায় প্রতি আসনেই একাধিক বিকল্প প্রার্থী
বিএনপি সরকারি প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনসহ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা মনে করছে, নানা অজুহাতে তাদের প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। এজন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ছাড়া প্রায় প্রতিটি আসনে দুজনকে মনোনয়নের চিঠি দিচ্ছি। যাতে কোনও কারণে একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেলে অন্যজন নির্বাচনে লড়ার সুযোগ পান।’ গতকাল বিকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
২০ দলকে ৪০, ঐক্যফ্রন্টকে ২০ আসন
পুরানো সঙ্গী ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সর্বোচ্চ ৫৫-৬০টি আসনে ছাড় দেবে বিএনপি। এর মধ্যে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের ৩৮-৪২টি ও ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের ১৫-২০ টি আসন দেওয়া হবে। এ নিয়ে গতকালও বৈঠক হয়েছে। ড. কামাল হোসেন গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পিঠা ভাগ করতে গেলেও টানাটানি করতে হয়। এই কাজ একটা চ্যালেঞ্জ। আমি নিজেও ভাবতে পারিনি, আমাদের এই জোট এত দ্রুত গঠন করা যাবে। আপনারা অবশ্যই বোঝেন যে, যেকোনো জায়গায় যেকোনো সমাজে কিছু কাড়াকাড়ি হবে। ভাগ করা মানে কী? কেউ পাবে কেউ পাবে না। কাজগুলো কঠিন। কিন্তু কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে আসন বন্টন চূড়ান্ত হবে। তাড়াহুড়ার কিছু নেই।
জানা গেছে, জামায়াত ইসলামীকে-২৮,এলডিপিকে-৪, বিজেপি-১, এনপিপি-১, কল্যাণ পার্টি-১, খেলাফত মজলিস-১, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম-২ এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ২০ আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে আসন ভাগাভাগি এটাই চূড়ান্ত নয়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত এ নিয়ে ২০ দলীয় জোটের শরীক ও ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আরো আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির এক নেতা।
শুরুতেই বিদ্রোহ, সান্ট’র চিঠি প্রত্যাখ্যান
একই আসনে একাধিক মনোনীত প্রার্থী থাকায় শুরুতেই বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় মনোনয়ন আনতে যান বরিশাল-২ আসনের মনোনয়নের চিঠিপ্রাপ্ত শরফুদ্দিন সান্টু। নিজ আসনে তিনজন প্রার্থীর নাম দেখে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাখান করেছেন বলে জানান।
শরফুদ্দিন সান্টু বলেন, আমার আসনে এক নম্বর প্রার্থী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালেরও নাম রয়েছে। আমার নাম দুই নম্বরে। তিন নম্বরে আছেন শহীদুল হক জামাল। ফলে আমি মনোনয়ন প্রত্যাখান করে এসেছি। তিনি বলেন, আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবো। আমি এদের থেকে কম যোগ্য নই।
অঝোরে কাঁদলেন ফখরুল
দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপি প্রথমবারের মতো নির্বাচনে যাচ্ছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলে অঝোরে কাঁদলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মির্জা ফখরুল বলেন, চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে বিএনপি এই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। খালেদা জিয়া তিনটি আসনে দলের প্রার্থী হচ্ছেন। এগুলো হলো ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭।
ফখরুল বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি আন্দোলন সৃষ্টি করে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার পাশাপাশি জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চাই।
