পিচ্চির খপ্পরে

আপডেট : ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৬

পড়ালেখার সুবাদে এক দিদির বাসায় উঠেছি। দিদির ফ্যামিলি বড় না, মাত্র চারজনের। এই ছোট ফ্যামিলির সবচেয়ে ছোট সদস্য ক্লাস ফাইভে পড়ে। দিদির সেই ছোট মেয়ে, মানে আমার ভাগ্নির বয়স কম হলেও খুবই বুদ্ধিমতী। বাসায় পান থেকে চুন খসলেই ওর চিত্কারে ঝড়-তুফান শুরু হয়ে যায়! প্রতিনিয়ত ওর দাদা মানে ভাগ্নের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া লেগে থাকে। অবশ্য এই ঝগড়ায় কেউ জিতে বা হারে না। তাদের পিঠের ওপর দিদির কিল পতনের মধ্যদিয়ে ঝগড়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। বাসার সবাই পিচ্চিকে, মানে ভাগ্নিকে খুব আদর করে। ভাগ্নি আবার স্থান, কাল, পাত্রভেদে কথা বলায় পটু। বলা যায়, হাঁটতে শেখার আগে দৌড়াতে শিখে গেছে। বাসার কেউ তার সঙ্গে কথায় পেরে ওঠে না। তার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে এমনভাবে কথা বলা শুরু করে যে, ওই জিনিস আর কিনে না দিয়ে পারা যায় না। যখন ভাগ্নি হাতে চিরুনি নিয়ে আমার মাথার চুল সুন্দর করে আঁচড়িয়ে দেয়, তখন আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, আজ নির্ঘাত পকেট থেকে টাকা খসবে। অবশ্য যখন ওর কোনোকিছুর প্রয়োজন হয় না, তখন যদি বলি ‘মামার আঙুলগুলো একটু টেনে দাও তো, মামার মাথার চুলগুলো একটু ম্যাসেজ করে দাও তো’, তখন কিন্তু ভাগ্নি ধারেকাছেও ঘেঁষবে না। ওদের বাসায় ওঠার পর থেকে ভাগ্নি মনে করেছে, আমি বিশাল এক বড় লোকের সন্তান। আমার বাবার অনেক টাকা-পয়সা আছে। আমাদের বিশাল দালান-কোঠা আছে। আমাদের বাড়ি দেখতে সে অনেকবার যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পড়াশোনার ব্যস্ততার কারণে সময় হয়ে ওঠেনি তার। বেশ কয়েকবার সে আমাকে আমাদের বাড়ির ছবি মোবাইলে তুলে আনতে বলছিল, কিন্তু তা আমি এড়িয়ে গেছি। একবার তো বলেই দিলাম, ‘হোয়াইট হাউসের মতো বিশাল বাড়ির ছবি চার-পাঁচ ইঞ্চির নগণ্য মোবাইলের স্ক্রিনে আঁটে না। তাই ছবি তুলিনি।’ ভাগ্নি আমার কথা শুনে আরো হতভম্ব হয়ে যায়। দুনিয়ার যত ধরনের চাপাবাজি আছে আমি সব তার সঙ্গেই মারি! তো একদিন দুপুরবেলা সবাই একসঙ্গে খেতে বসছি, হঠাত্ কারেন্ট চলে গেল। এমনিতে চৈত্রের প্রচণ্ড গরম, তার ওপর কারেন্ট চলে গেছে। সবার নাজেহাল অবস্থা! ভাগ্নি আমার আবার গরম সহ্য করতে পারে না। শীতেও সে ফ্যান ছেড়ে ঘুমায়। দিদি ছোট্ট টেবিল ফ্যানটা এনে ছেড়ে দিল। তখন আমি ভাগ্নিকে বললাম, ‘তোর বাবা তো গরিব, তাই একটা আইপিএসও কিনতে পারেনি। তুই আমাদের বাসায় গিয়ে দেখিস গুনে গুনে দশটা আইপিএস পাবি। শুধু আইপিএস না! আমাদের ড্রয়িংরুমে যে এসিটা আছে, ওটা তোদের একটা রুমের সমান। তুই যদি একবার আমাদের বাড়িতে যাস, তখন তোর ফিরতেও ইচ্ছে করবে না।’ কথাগুলো শুনে ভাগ্নি হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আর সবাই মুচকি মুচকি হাসছে। আপনারা ভাবছেন ও কথাগুলো সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে নিল। ও অত বোকা না! এর কয়েকদিন পর দিদি আমাকে বলেছেন, ভাগ্নি নাকি তাঁর কাছ থেকে কথাগুলো সত্যি কি না তা জিজ্ঞেস করেছে। তখন দিদি বলেছেন, ‘তোর মামা যা বলেছে তা সব সত্যি।’ বেশ কিছুদিন পর আমার ছোট ভাই তাদের বাসায় বেড়াতে এল। ভাগ্নি তার কাছেও জিজ্ঞেস করল, আমি যা বলেছি তা সত্যি কি না? অবশ্য আমার ভাই আমার চেয়েও এক কাঠি সরেস। সেও নাকি বলেছে, ‘আমাদের বাসায় যে এলইডি টিভিটা আছে, ওটা তাদের বারান্দার সমান।’ ভাগ্নি এবার সত্যি সত্যি মনে করতে লাগল আমাদের ঘর ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। ভাগ্নি প্রতিজ্ঞা করেছে এবারের স্কুুলের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। আর আমাকে সতর্ক সংকেত দিয়ে বলেও রেখেছে, ‘মামা তুমি যা বলেছ, তা যদি সত্যি না হয়, আমাকে তোমার টিউশনির সম্মানী দিয়ে জামা কিনে দিতে হবে।’ এখন আমি তাকে নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টে করে যাচ্ছি আমাদের বাড়িতে না যাওয়ার জন্য। বলেও যাচ্ছি আমাদের বাড়িতে ভূতের উপদ্রব বেশি, ওখানে সবসময় আত্মা ঘুরে বেড়ায়। অবশ্য সে কথায় আদৌ কাজ হবে কি না কে জানে!