রুশেলী :একজন চাপাসর্বস্ব মহামানব

আপডেট : ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৭

রুশেলীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ফার্স্ট ইয়ারে টিএসসিতে। দীর্ঘকায় সেই ছেলে, থামের মতো মোটা মোটা পা ফেলে অহেতুক মুখের অনেক কাছে এসে ‘তিন হাত লম্বা একটা হাত’ বাড়িয়ে দিয়ে অন্য হাতে কাঁধ হাতিয়ে বলেছিল, ‘আমি আবু জান্দাল ইবনে আহমদ আল খোয়ারিজমি নাসিম রুশেলী।’ তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর নাম কী?’

করমর্দন করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘তোর নাম শুনতে শুনতেই তো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল, প্রস্থানরত সূর্য দেবতার একঘেয়ে ম্লান ক্ষীণ আলোকে হঠাত্ নিরুদ্দেশ করে দিয়ে জ্বলে উঠল দ্বিধান্বিত সোডিয়াম বাতি, বিষণ্ন আকাশের বুকে উদ্দেশ্যহীনভাবে উড়তে থাকা শেষ কাকটাও তার ভাড়াবাসায় চলে গেল এইমাত্র, হয়তো সে ফ্রেশ হয়ে বাচ্চাকাচ্চাকে হোমওয়ার্ক ধরিয়ে দিয়ে কাকিনীর সাথে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে বসেও গেছে এরমধ্যে! ... আমার নাম নাহয় আরেকদিন শুনিস।’

সেদিনই রুশেলীর সঙ্গে প্রথম এবং অবশ্যই শেষবারের মতো হ্যান্ডশেক করা, কারণ ওর হাত ছিল অশোক স্তম্ভের মতো শক্ত, মজবুত!

হ্যান্ডশেক করে মনে হয়েছিল কিছুক্ষণ নষ্ট হওয়া টিউবওয়েল চাপলাম।

তখন ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলিনি কিন্তু পরে যখন ব্যাপারটা বলেছি, তখন ও ষাঁড়ের মতো হুঙ্কার দিয়ে বলেছে, ‘জানিস! আমার দাদা ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা! মঙ্গল পান্ডে ছিল তার হলেরই ছোট ভাই।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘মঙ্গল পান্ডে কোন হলে থাকত?’ এবং নিশ্চিতভাবে পরবর্তী দেড় ঘণ্টা নষ্ট করলাম।

রুশেলী বিরক্ত হয়ে তার বরিশাইল্লা মাতৃভাষায় বলতে লাগল, ‘ধুর ব্যাডা! তুই তো সিটামডাই বুঝলি না! হলটল এসব মুখ্য বিষয় না, বুঝাইতে চাইছি ইন্টিমিসি! দাদাজি ব্রিটিশদের থাপড়াতে থাপড়াতে হাতে কড়া ফেলে দিয়েছিলেন। আমি তার হাত পাইছি।’

আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম, ‘আইনস্টাইনের মগজের মতো তোর মৃত্যু পরেও তোর এই বজ্রমুষ্টি জাদুঘরে রাখা হবে। সামনে সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে—দূর হতে দর্শন করুন, কেহ চুম্বন করিবেন না!’

সেই সন্ধ্যায় টিএসসিতে জমিয়ে অনেক আড্ডা দেওয়ার পর রুশেলী বলেছিল, ‘ক্যাফেটেরিয়ায় চল, ওখানে ১০ টাকায় শিঙ্গারা, সমুচা, চপ আর এককাপ চা পাওয়া যায়।’

ওর অন্যসব চাপার মতো এটাকেও চাপা ভেবে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছিলাম, সেই ভুল ভেঙেছিল অনেককাল পড়ে। সেদিন অঝরে কেঁদেছিলাম। ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলাম!

তারপর রুশেলীর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হতো, দেখা হলেই আমার আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা নষ্ট করে দিত। কখনো জিজ্ঞেস করত, ‘হাশিম ভাইকে চিনিস? কাছিম ভাইকে চিনিস?’

আমি বারবার মাথা নেড়ে না বলে ওকে হতাশ করে দিতাম। তারপর এমন ভর্ত্সনা শুনতাম যেন আমি নিজের বাপের নাম লিখতেই ভুল করে ফেলেছি। কাছিম ভাইয়ের নাম শুনে তো বলেই ফেলেছিলাম, ‘ভাই কি জহু হলের পুকুরে থাকে?’

সে আমাকে শাপশাপান্ত করে বলল, ‘এ তুই কি বলদ নাকি বেয়াদব, ভাই পুস্কুনিতে থাকপে কেয়্যা?’

আমি তখন বুঝতে পারলাম কাছিম মানে কচ্ছপ না, কোনো মানুষ হবে। কিন্তু আমার কি দোষ! আমি তো আমার দাদির কাছে ছোটবেলায় পীর-আওলিয়াদের অভিশাপে জ্বিনদের জ্বিন থেকে কাছিম হয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ গল্প শুনেছি।

এরও কিছুকাল পরে বুঝতে পারলাম রুশেলী কেউকেটা কোনো লোক নয়!

আমি কোন কোন মেয়ের ছবিতে লাভ দিই, কাকে কমেন্ট করি, কার আইডি ঘাটাঘাটি করি সব বের করে ফেলে আর মাঝেমধ্যে এসে থ্রেট দেয়, ‘ও আমার, সে আমার, তাকে আমি না পেলে কেউ পাবে না! আমি কিন্তু হিস্টোরিতে পড়ি, ঢাল-তলোয়ার, তীর-ধনুক নিয়া কারবার আমার! ওর পথ থেকে সরে যা!’

ছোটবেলায় ছোটভাইকে সব খেলনা দিয়ে দেওয়ার মতো আমিও বলতাম, ‘আজ থেকে হলসহ সব তোকে দিয়ে দিলাম যাহ, ভাগ এখন!’

এতক্ষণ যে গল্প বললাম, সব ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ারের গল্প। রুশেলীর সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। তবে শুনেছি সে কোনো এক ডাইনির মায়ায় মোহাবিষ্ট হয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে নেশাগ্রস্ত যুবকের মতো চিত্কাত হয়ে পড়ে থাকে।

হঠাত্ সেদিন সিঁড়ির মুখে রুশেলীর সঙ্গে দেখা।

কাঁধে ভারী ব্যাগ, একহাতে পানির বোতল, অন্য হাতে স্বচ্ছ পলিথিনের ভেতরে দেড় হালি ডিম।

ওর গৌরবোজ্জ্বল প্রতিটা পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্বয়ং চেঙ্গিস খান এইমাত্র ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজ্য জয় করে এলেন।

বনলতার কমন প্রশ্ন ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ জিজ্ঞেস না করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিম দিয়ে কী করবি, সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে নিয়ে বাচ্চা ফুটাবি?’

সে আমার প্রশ্নকে মাছি তাড়ানোর মতো করে বাঁ হাতে উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘দোস্ত, পুলিশ ক্যাডারের প্রিপারেশন নিচ্ছি, ক্যাডার হলে চোর-গুন্ডা-বদমাশকে রিমান্ডে ডিম থেরাপি দেওয়া লাগবে না? দিনদিন ডিমের যা দাম বেড়ে যাচ্ছে তাই এখনই কিনে রাখলাম।’

আমি ওর আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শী পরিকল্পনায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না!

বলাই বাহুল্য, দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেভাগে ডিম কিনে রাখা রুশেলীর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ প্রায় সাড়ে তিন বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে আমাকে এককাপ চাও খাওয়ায়নি, চপ-শিঙ্গারা তো বহুদূর!