‘ছড়ার বই তো চলে না’ শিরোনামে প্রথম ছড়ার বইয়েই মাত করেছিলেন তিনি! অনবরত গান লিখেও সুনাম কুড়িয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা ‘চোরাবালি’র ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’ গানটারও গীতিকার তিনি, করেছেন কয়েকটি বই সম্পাদনাও। সবকিছুই যুগপত্ভাবে চলছে তার। এতকিছুর পরেও জনপ্রিয় স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান প্রযোজকের জায়গাটা ধরে রেখেছেন দক্ষতার সাথেই। ‘আমার আমি’ এবং ‘গান ও ফান’-এর মতো দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রযোজনা করছেন তিনিই। আর বিশেষ দিনে বিশেষ আয়োজনে বাংলাভিশনের দর্শকদের জন্য নানামাত্রার অনুষ্ঠানের প্রযোজকের তক্মাটা তাকে দিতে হয়। হরেক গুণের এই মানুষটি হচ্ছেন সাজ্জাদ হুসাইন। তার পথচলা নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসর শিশুতোষ লেখালেখির স্বর্গরাজ্য তখন, সম্পাদকের হাত পেরিয়ে লেখা ছাপানো মানে বিশাল ব্যাপার! সাজ্জাদ হুসাইন এই পরীক্ষা উের গেলেন, মিহির কান্তি রাউতের হাত ধরে প্রথম ছড়া ছাপা হলো কচি কাঁচার আসরে! সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া সাজ্জাদ তখন ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। আসলে প্রতিটি লেখাই লেখকের কাছে সন্তানের মতো। আর প্রথম লেখার অনুভূতিটাই তাই অন্যরকম ছিল। লেখার মাঝেই খুব মজা পেয়ে গেলেন তিনি। যখনই ছাপার হরফে তার লেখা আসে, সেই খুশির বাঁধ ভাঙে। ততদিনে স্কুল-কলেজের ডিঙ্গি পেরিয়ে বাংলায় স্নাতকে পড়েন তিনি। মনটা তবুও লেখালেখিতেই পড়ে থাকল। আনন্দ বিনোদন নামের একটি পাক্ষিক ম্যাগাজিনেও উপ-সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বছর দুয়েক কাজ করেন তিনি, চারবেলার ফিচার রিপোর্টার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। পত্রিকার কাজটা ভালোই যাচ্ছিল, একটা সময় রোজকার এই পেজ মেকআপ একঘেয়ে মনে হতে থাকল তার কাছে, প্রতিদিনই একই রকম কাজের নকশা তার তেমন পছন্দ হতে চাইল না। চাইছিলেন একটু ভিন্নতা। আর সৃজনশীল জগতের মানুষরা একটু এ রকমই হয়ে থাকেন, কোনো কাজ চাপিয়ে দিয়ে করানো যায় না তাদেরকে, বরং স্বেচ্ছায় আরও বেশি দিয়ে যান তারা আমাদের। তাই তিনিও ব্যতিক্রম কিছু করার ভাবনা থেকে শামীম শাহেদের অনুপ্রেরণায় যোগ দেন বাংলাভিশনে। মাঝে কিছুদিন একুশে টেলিভিশনে কাজ করলেও আবার ফিরে আসেন তিনি বাংলাভিশনে। প্রথম দিকে অনুষ্ঠান সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীতে প্রযোজক হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন, এখনও করছেন।
ছড়া লেখার শুরুটা কিন্তু সেই কচি কাঁচায় শুরু হওয়ার পর আর থেমে থাকেনি। এমন কোনো শিশুতোষ পাতা বা পত্রিকা নেই যে সেখানে তার লেখা ছাপা হয়নি। একদিন ঐতিহ্যের আরিফুর রহমান নাইম তার কাছে পাণ্ডুলিপি চেয়ে বসলেন, সেই প্রথম মলাটবদ্ধ হলো তার ছড়া। এর পর একে একে বেরিয়েছে ‘ফুলবাবু-ভুলবাবু’ (প্রকাশনী—ঐতিহ্য) সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সংগীতায়োজনে ছড়াগানের অ্যালবাম, ‘জো হুকুম মহাশয় জো হুকুম আজ্ঞে’ (প্রকাশনী—ঐতিহ্য)। এ ছাড়া গীতিকবিতার বই বেরিয়েছে ‘বন্ধু, দুঃখ নিও (প্রকাশনী—অনন্যা) নামে।
এই প্রজন্মের মেধাবী এই মানুষটা গানের জগতে প্রবেশ করেন আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে, তার এই গান লেখার তালিকায় রয়েছে, ‘স্পর্শ’ (এলআরবি, অ্যালবামের সবকটি গান, ২০০৭ সালে), ‘যুদ্ধ’ (এলআরবি, অ্যালবামের ০৯ টি গান, ২০১২ সালে), ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (আইয়ুব বাচ্চুর একক, অ্যালবামের ০৭টি গান, ২০০৮ সালে), ‘বলিনি কখনো’ (আইয়ুব বাচ্চুর একক, অ্যালবামের ০২টি গান, ২০০৯ সালে), ‘দরজা খোলা বাড়ি’ (হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের একক, ০৬টি গান, ২০০৯ সালে)। সম্প্রতি তার করা মিউজিক ভিডিও প্রচার শুরু হয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলে। কলকাতার সিনেমা ‘নদী রে তুই’-এর জন্য লেখা লিখেছেন মৌলিক সবকটি গান। কিংশুকের পরিচালনায় ও দ্রোণ আচার্য্যর সুর-সংগীতে গানগুলো গেয়েছেন নচিকেতা, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, আনান ও প্রমা। যা ক’দিন আগেই জি-সিরিজ থেকে বাজারে এসেছে।
সাজ্জাদ হুসাইনের জন্ম নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায়। দাদাবাড়ি নেত্রকোনার কুলিয়াটী । নানাবাড়ি ফতেপুর। বাবা আদমজী জুট মিলে কাজ করেছেন অনেকদিন, সেখানেই তাদের বেড়ে ওঠা। মা একজন গৃহিণী। পরিবারের ভাইবোনদের মাঝে সবার চেয়ে ছোট ছিলেন বিধায় অনেক আদর স্নেহে বড় হয়েছেন সাজ্জাদ। এখন ঢাকায় স্ত্রী ফারিহা রুবাইয়াত্ খানের সাথেই রচিত হয় তার সুখের দিনলিপি।
সাজ্জাদ বিশ্বাস করেন, পরিকল্পনা করা যেমন জরুরি, সেই অনুযায়ী সব কাজ হয় না এটাও সত্যি। তিনি বরং সমকাল নিয়েই বেশি ভাবেন, সেই মাফিক কাজ করতে ভালোবাসেন। আর স্বপ্ন! কিছুটা হেসে সাজ্জাদ বলেন, ‘সেটা তো নিজের মতো করে দেখি, প্রতিদিনই নতুন করে নতুন নতুন স্বপন দেখা।’ নতুন কোনো সম্ভাবনার পথে প্রতিদিন হেঁটে চলেছেন প্রজন্মের এই প্রতিনিধি। তার হাত ধরে আরও অনেক নতুনত্বের সন্ধান মিলবে এই জগতে, তেমনটাই শুভকামন তার জন্য।
