আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলির ঋণ সক্ষমতা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৪২
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের সমাপনী হিসাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ আমানত অনুপাত নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়। সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ আমানতের অনুপাত দাঁড়াইয়াছে ৭৬ দশমিক ৫৯ শতাংশে। এই সীমা বা অনুপাত প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলির জন্য মোট আমানতের ৮৫ শতাংশ। সীমার মধ্যে থাকা নিঃসন্দেহে ভালো কথা। কিন্তু সর্বোচ্চ সীমার অনেক নিচে থাকা কোনভাবেই ভালো কথা নয় অর্থনীতির বর্তমান গতিধারায়। কারণ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সময়কালে মুদ্রা প্রবাহের প্রবৃদ্ধি কম থাকায় যে কোন অর্থকরী ব্যাংকগুলি তার আমানতের বিপরীতে অধিক হারে ঋণ তৈরি কিংবা ঋণ প্রদান করে থাকে। ব্যাংকগুলির এই অতিমাত্রায় ঋণ তৈরির কারণে যেন কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয় সেইদিকে খেয়াল রাখিয়াই ঋণ আমানত অনুপাত-এর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করিয়া দেওয়া হয়। যখন সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি চলমান থাকে তখন মুদ্রা প্রবাহের প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের চাপ থাকে। সেই সময়ে ঋণ আমানত অনুপাত সর্বোচ্চ সীমা হইতে অনেক নিচে থাকিতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত কয়েক বত্সরে তাহার ব্যতিক্রম দেখা গিয়াছিলো শেয়ার মার্কেটে অনেক টাকা ব্যাংকিং খাত হইতে বিনিয়োগ হওয়ায়। এখন প্রশ্ন হইলো, আমানতের বিপরীতে ঋণ প্রদানের পরিমাণ আগের বত্সরগুলির তুলনায় কম কেন? গত বত্সর ব্যাংকিং খাতে ঋণের চাইতে আমানতের পরিমাণ বাড়িয়াছে। ডিসেম্বর শেষে দেশের ৪৭টি ব্যাংকের গড় আমানতের প্রবৃদ্ধি হইয়াছে ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ, যাহার বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হইয়াছে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। তাহার মানে আমানতের প্রবৃদ্ধির বিপরীতে অনেক কম পরিমাণে ঋণ প্রদান করা গিয়াছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৬৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এই রকমটি ঘটে ব্যাংকগুলি যখন তাহার আগের বত্সরগুলিতে আমানতের বিপরীতে প্রচুর পরিমাণে কুঋণ তৈরি করে। অনেক বেশি পরিমাণে কুঋণ তৈরি হইলে আগের বত্সরগুলির আমানতকারীদের চাহিদা মিটাইবার জন্য বর্তমান আমানতের বেশ খানিকটা রিজার্ভ রাখিতে হয়। আর সেই কারণে বর্তমান বত্সরের আমানতের প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ঋণের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ আপেক্ষিকভাবে অনেক কম হইতে দেখা যায়। কেহ কেহ দাবি করিতে পারেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে এমনটি হইয়াছে। এই দাবির সাথে একাত্ম হইয়াও বলা যায় যে, একই কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর হইয়াছে। কারণ আগের বত্সরগুলিতে আমানতের একটা অংশ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হওয়ার কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাত্ বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হইতে হইয়াছে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হইবে হয়তোবা। ব্যাংকিং খাতের টাকায় যে পরিমাণ শেয়ার কেনা রহিয়াছে তাহা কিন্তু ক্রয়কৃত মূল্যেই দেখানো হইতেছে ব্যাংক-এর হিসাবের খাতায়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ঐসব সম্পদের মূল্য অনেক কমিয়া গিয়াছে। অন্যদিকে ঐসব সম্পদ বিক্রি করিতে না পারার কারণে সমুদয় অর্থ উদ্ধার করিয়া আমানতকারীদের সুদসহ প্রদান করা যাইতেছে না। ফলে নূতন ঋণ প্রদান কম করা যাইতেছে। আবার বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার কারণে ব্যাংক হইতে যে টাকা খোয়া গিয়াছে তাহার জন্যও বর্তমান আমানত হইতে বিভিন্নভাবে প্রভিশন রাখিতে হইতেছে। মোট কথা, ব্যাংকিং খাতে যে অনিয়ম আমরা দেখিতেছি বিগত সময়ে তাহার জন্য আমরা কিন্তু মাশুল দিতে শুরু করিয়াছি। সেই জন্য আমাদেরকে ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হইবে অতিশীঘ্রই। অন্যদিকে আমাদের মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় এই বিষয়গুলিকে মাথায় নিয়া আরো একটু বেশি সম্প্রসারণমূলক নীতির দিকে ধাবিত হওয়া উচিত। তাহা না হইলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন হইতে আমরা আরো পিছাইয়া যাইতে পারি। অবশ্যই সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও আমাদের খেয়াল রাখিতে হইবে আমানতের বিপরীতে সৃষ্ট বিনিয়োগ যেন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়।