ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে জামায়াত-শিবির যে ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে, তার দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। কিছু ব্লগারের ব্যক্তিগত লেখাকে কেন্দ্র করে জামায়াত অপপ্রচার চালাচ্ছে। একজন ব্লগারের ব্যক্তিগত মতামতকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির ও তাদের মিডিয়াগুলো আমাদের পুরো আন্দোলনকে নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায় আকস্মিক সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এসব অভিযোগ এনে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সে কারণে আমরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নয়, যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতা এবং তাদের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছি। এদের মদদদাতা প্রচার মাধ্যমগুলোকে বয়কটের দাবি জানিয়েছি।
ইমরান বলেন, ‘আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ইসলাম বিরোধী উস্কানিমূলক প্রচারণার কারণে আমাদের জাতীয় মসজিদে আগুন দেয়া হয়েছে, ইমামকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তারা কোন ধরনের মুসলমান, যারা মসজিদে হামলা করে, শহীদ মিনার ভাঙচুর করে, জাতীয় পতাকায় আগুন দেয়! গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বলতে চাই, মসজিদে আগুন দিয়ে, ইমামকে লাঞ্ছিত করার মাধ্যমে এরা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য কাজ করছেন। ইসলাম আর জামায়াতে ইসলামী এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ আজ আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখীন। স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে আমাদের এই যুদ্ধ চলবে এবং এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবিগুলো রাজনৈতিক। তবে কোন দলীয় প্লাটফর্ম থেকে এ দাবি আসেনি। এ মঞ্চ কোন দলীয় প্লাটফর্ম নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠনগুলো এতে যুক্ত রয়েছে। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য গণজাগরণ মঞ্চ কখনোই পরিচালিত হয়নি। এ বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছি।
সাংবাদিক সম্মেলনে ডা. ইমরান এইচ সরকার আরো বলেন, ‘জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করছি। বাংলাদেশের ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবশ্রেণির মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আমরা এই আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে যাচ্ছি। সেই ধারাবাহিকতায় মিরপুরের গোলচক্করে আমাদের সমাবেশ হয়েছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। আমাদের আন্দোলনের ফলেই সংসদে ট্রাইব্যুনালের সংশোধনী পাস হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবি সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ রয়েছে ছয় দফা দাবির মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশ গড়তে চাই। তিনি বলেন, অনেকেই আমাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। গণচাঁদা তুলে খাবারের ব্যবস্থা হয়। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের মাধ্যমে খাবার আসতে থাকে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আমরা বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের আপাতত সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।
ধর্ম সংক্রান্ত বিভ্রান্তির জবাবে তিনি বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের অনুপ্রেরণা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল না, তেমনি এ আন্দোলনের সঙ্গেও ধর্মের কোনো বিরোধ নেই। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, এ আন্দোলনের প্রথম থেকেই গণজাগরণ মঞ্চ সব ধর্মের মানুষের অনুভূতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং আছে। ভবিষ্যতেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার।’ কিন্তু এই আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করার জন্য নানা অপচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করছি। আপনারা দেখেছেন, কিছু ব্লগারের ব্যক্তিগত পোস্ট বা লেখাকে কেন্দ্র করে কীভাবে জামায়াত-শিবির ও তার দোসররা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছে। তারা এ আন্দোলনের ওপর বিভিন্ন মিথ্যা দায় চাপিয়ে দিতে চাইছে। কোনো ধরনের ধর্মীয় অবমাননাকর অপতত্পরতার সঙ্গে প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা যে কোনো ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে। আমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সম্পর্কে সব রকম কুরুচিপূর্ণ আক্রমণের বিরোধিতা করি, তীব্র নিন্দা জানাই। এ ধরনের অপতত্পরতাকে কোনোভাবেই এই গণজাগরণ মঞ্চে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি, কখনো দেয়াও হবে না। ৫২’তে যেমন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাকে হিন্দুদের ভাষা বলা হয়েছিল, একাত্তরে অন্যায় শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে মহান মুক্তিযুদ্ধকে ইসলাম বিরোধী আখ্যা দেয়া হয়েছিল, একইভাবে আজকে গণহত্যাকারীদের বাঁচাতে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেয়া হচ্ছে।
ইমরান বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নয়, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকারের কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে উল্লিখিত ছয় দফা দাবিতে ধর্মকে পুঁজি করে ধর্মব্যবসায়ী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের যে অপরাজনীতি তা নিষিদ্ধ করার কথা ঘোষণা করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারির মহাসমাবেশ থেকেও সোচ্চার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার কথা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের কোনো অবস্থান নেই, কারণ আমরা প্রথম থেকেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যেকে সামনে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। সব যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাত্ মৃত্যুদণ্ডের রায় দেশবিরোধী সংগঠন জামায়াতে ইসলাম ও তাদের বর্বর সন্ত্রাসী বাহিনী ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি আমাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
রাজীব হত্যার পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাজীবকে হত্যার পর তার নামে বানোয়াট আইডি খুলে কমিউনিটি ব্লগে আপত্তিকর পোস্টকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে কুখ্যাত ‘আমার দেশ গং’। এ কাজ করে তারা নিজেরাই ধর্মীয় অবমাননার অপরাধ করেছে। এর ভিতরে মহানবীর (স.) প্রতি কোনো ভালোবাসা ছিল না, ছিল হীনরাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার বাসনা।
ইমরান এইচ সরকার তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ আজ আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে। এ লড়াই যুদ্ধাপরাধী মুক্ত একটি সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক সমাজ তথা রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই লড়াই দেশপ্রেমিক জনগণের লড়াই। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-গণতন্ত্র বিরোধী জামায়াত-শিবির ও তাদের দেশি-বিদেশি দোসরদের বিরুদ্ধে এ লড়াই প্রজন্মের লড়াই। এই লড়াই কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, এ লড়াই জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মানুষের লড়াই। আমরা যুদ্ধাপরাধের বিরোধী, কিন্তু ধর্ম বিরোধী নই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যেমন আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম বিজয়, এ লাড়াইয়েও আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনবো । তারুণ্যের অগ্নিশপথ কখনও বৃথা যেতে পারে না।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে রাজপথে নামে দেশের তরুণরা। তাদের আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়ে সমবেত হয়েছেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ। সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ ছয় দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন গতকাল মঙ্গলবার ২২তম দিন পার করল। ইতিমধ্যে এ আন্দোলনে কয়েকটি সাফল্য লাভ তরুণদের উজ্জীবিত করেছে।
মতিঝিলে সমাবেশ বিকালে
এদিকে ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবির পক্ষে জনগণের আরো সম্পৃক্ততা বাড়াতে আজ বুধবার বিকাল তিনটায় মতিঝিল শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের আয়োজন করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু জানান, সমাবেশের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সমাবেশ সফল করতে গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে সহায়তা চেয়েছেন তারা। আর ছয় দফা দাবিতে গতকাল সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শাহবাগে শ্লোগান দেন ছাত্র-জনতা। গণস্বাক্ষর করেন সর্বস্তরের জনতা। আগামী সাত মার্চ পর্যন্ত এ গণস্বাক্ষর চলবে।
