গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর সকল মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ চেয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিচ্ছে নির্বাচন কশিমন (ইসি)। নির্বাচনকালীন ইসির মতামত ছাড়া নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন- এমনকি তাদের প্রত্যাহার না করারও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিষয়ে কমিশনের যে কোন সিদ্ধান্ত দু’দিনের মধ্যে কার্যকরের প্রস্তাব থাকছে খসড়া আরপিওতে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে আরপিও খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। কমিশনের কোন আদেশ পালনে কেউ ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। আশা করছি আরপিও’র খসড়া বৃহস্পতিবার কমিশন সভায় অনুমোদনের পর দ্রুত তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন নির্বাচনী আইনের বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠালেও তা গৃহীত হয়নি। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তাদের মতামতের জন্য প্রস্তাবটি ইসি’র কাছে ফেরত পাঠায় আইন মন্ত্রণালয়। বর্তমান কমিশন আগের কমিশনের প্রস্তাবসমূহ পর্যবেক্ষণ করে আরপিও’র খসড়া চূড়ান্ত করে। আরপিও’র খসড়া অনুযায়ী ৪৪ই (৪) ধারাতে বিগত কমিশন যে চারটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে নির্বাচনকালীন সময়ে সকল মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কমিশনের মতামত গ্রহণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রথমদিকে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়া পর থেকে নতুন কোন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত মন্ত্রণালয়গুলো সম্পর্কে কমিশনের মতামত গ্রহণের বিধান রাখা হলেও পরে তাতে পরিবর্তন আনা হয়। ৪৪ই (১) ধারায় বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ১৫ দিন পর্যন্ত মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার এবং তাদের অধস্তন কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়ে ইসির মতামত গ্রহণ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ৪৪ই (২) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, বদলি সংক্রান্ত কমিশনের যে কোন অনুরোধ ২দিনের মধ্যে কার্যকর করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনকে না জানিয়ে নির্বাচনকালীন কাউকে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন করলে আরপিও’র খসড়ার ৮৬ ধারায় শাস্তি হিসেবে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকার অর্থ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ৮৬ (এ) তে বলা আছে, কোন ব্যক্তি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ৩ বছরের দণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একইভাবে ৮৬ (বি) তে বলা হয়েছে, কমিশন যে কোন আদেশ পালন রাষ্ট্রের কোন বিভাগ ব্যর্থ হলে ওই বিভাগের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া এখন থেকে শুধু ব্যালট পেপারে নয়, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংসদ নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। খসড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ২৬ (এ) ধারায় ইভিএম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরপিও’র ২৬ (এ) তে বলা আছে, ‘... ভোটিং মেশিনের পাশাপাশি ব্যালট বাক্স বা ব্যালট পেপার নির্বাচনের ভোট গ্রহণে ব্যবহার করা যাবে।’
আরো যেসব পরিবর্তন
ইসির প্রস্তাবে আরপিও’র ২ নং ধারা (ক) (৬) এ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী’র সংজ্ঞা পরিবর্তন ও ১৬ নং ধারা (ক) পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরে প্রতীক বরাদ্দের জন্য দল যাকে চূড়ান্ত করবে তিনিই হবেন একমাত্র দলীয় প্রার্থী। বাকিদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে।’ হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও সদস্যপদ বাতিলের সুযোগ, প্রার্থীদের নির্বাচন ব্যয় ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীতকরণ, প্রার্থীর জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীতকরণ, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ব্যয় বৃদ্ধি করা, দলীয় প্রধানের নির্বাচনী খরচ নির্ধারণ, জরিমানার অংক নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল স্পষ্টকরণ, নির্বাচনী আচরণবিধির শাস্তি আরো কঠোর করা, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অপরাধের জন্য তাত্ক্ষণিক শাস্তির বিধান করার মতো বিষয় প্রস্তাবে রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অপরাধের জন্য তাত্ক্ষণিক শাস্তি হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজের বিধান, নির্বাচন-পরবর্তী ১ মাস নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখা, প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় যাচাইয়ে মনিটরিং কমিটি রাখা, তৃণমূল থেকে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি প্রমাণসহ যাচাই করা, মনোনয়ন পেতে দলে ৩ বছর থাকাটা বাধ্যতামূলক করা, নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ভিডিও ক্যামেরা রাখা, প্রতিটি আসনে কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষক থাকা, প্রার্থীর প্রচারণামূলক পোস্টারে প্রেসের নাম ও মুদ্রণকৃত পোস্টারের সংখ্যা উল্লেখ করা, প্রচারণাকালীন এক সপ্তাহ পরপর রিটার্নিং অফিসারের কাছে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রদানসহ আরপিওতে আনা হচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
পাশাপাশি নবনিযুক্ত জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিক্রান্ত না হলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না পাওয়ার বিধানটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ সমর্থনসহ অন্যান্য বিষয়ও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
