সরকার কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে একটি কৃষিনীতি গ্রহণ করিয়াছে এবং তাহা চূড়ান্ত করিতে যাইতেছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় । কয়েকদিন আগে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘কৃষি উন্নয়ন : সরকারি সেবার দায়বদ্ধতা ও নীতি সহায়তা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গভর্নেস কোয়ালিশন ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ছিল ইহার উদ্যোক্তা। সেখানে কৃষিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণ অনেক ভাল কথা বলিয়াছেন। যেমন—মাঠ পর্যায়ে কৃষিজনবল বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষিভূমি ব্যবহার নীতি প্রণয়নসহ অনেক বিষয়ই আলোচনায় উঠিয়া আসিয়াছে। এই বিষয়গুলি অবশ্যই গুরুত্ব পাইবার দাবি রাখে। তবে আমরা মনে করি, সরকারের প্রস্তাবিত কৃষি নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করিতে হইলে সর্বাগ্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকারার্থে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত জাতীয় কৃষি নীতিতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি বীজ, সার, সেচ সুবিধাসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদানের বিধান করা হইয়াছে। ইহাছাড়া সরকারি প্রকল্পসমূহ ও অন্য সেবাসমূহের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার সুপরিশ করা হইয়াছে। কোন সুবিধা দিতে হইলে আগে সুবিধাভোগীদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করা চাই। মাঠ পর্যায়ে সরকারি কৃষি কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তারা এই কাজটি অনায়াসেই করিতে পারেন। এভাবে সরকারি সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ হইতে পারে। ইহাতে ৫-১০ ভাগ দুর্নীতির অভিযোগ উঠিলেও উঠিতে পারে, তাহাতে কিছু যায়-আসে না। তবে পুকুরচুরির ন্যায় বড় রকমের কোন অনিয়মের সুযোগ থাকিবে বলিয়া মনে হয় না।
আমাদের সরকার কৃষিপ্রধান ও উন্নয়নশীল দেশ বিবেচনায় আনিয়া কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বরাবরই ভর্তুকি প্রদান করিয়া আসিতেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ভর্তুকিতে কৃষকরা উপকৃত হইতেছে না বলিয়া অভিযোগ বহুদিনের। যদিও আমরা ভর্তুকিতে বিশ্বাস করি না। কারণ প্রকারান্তরে ভর্তুকির অর্থ আসে করদাতাগণের পকেট হইতে। অথচ তাহারা ইহা হইতে সরাসরি উপকৃত হন না। দ্রব্যমূল্য হ্রাসে তাহার কোন প্রভাবও লক্ষ্য করা যাইতেছে না। তাহার পরও আমরা কৃষিতে ভর্তুকি বলিতে গেলে মানিয়াই লইয়াছি। তবে কৃষি ব্যবস্থাপনার উন্নতিকল্পে ও কৃষকদের নিকট কোন আর্থিক সুবিধা সরাসরি পৌঁছাইয়া দিতে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত যথার্থ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিকল্প নাই। কেননা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক থাকিলেও তাহা আসলে কৃষিব্যাংক নহে। অন্যান্য ব্যাংকের ন্যায় একটি সিডিউল বা তফসিলি ব্যাংক।
বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমিতি গঠনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়া থাকে। এজন্য সমিতিই গ্রাহক সদস্যের গ্যারান্টার হইয়া থাকে। সবকিছুর ব্যাপারে সমিতি দায়বদ্ধও থাকে। অনুরূপভাবে সরকার প্রতি ইউনিয়নে এমন কৃষিব্যাংক প্রতিষ্ঠা করিতে পারে যাহা সম্মিলিত গ্যারান্টার ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করিবে। এভাবে ব্যাংক লাভজনকও হইতে পারে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ্য যে, কৃষি এমনই একটি খাত যেখানে সবকিছুকে ফুলাইয়া-ফাঁপাইয়া দেখার অবকাশ নাই। আমরা লক্ষ্য করিতেছি যে, প্রায় প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলিয়া আসিতেছে। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে পরিসংখ্যানকে বাড়াইয়া দেখানো হইতেছে। আবার সেইসঙ্গে খাদ্য আমদানিও করা হইতেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করিলে আমদানি খরচ হ্রাস পায়। রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি খবরদারি থাকে না। কিন্তু হিসাব ঠিকমত না মিলিলে সবখানেই ধরা খাইতে হয়। আমরা আশা করি, কৃষকদের উন্নয়নে সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত কৃষিব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মনোনিবেশ করিবে।
