মাছের আকাল, তবু পলো উত্সব

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৬
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের সাকিতপুর গ্রামের হাতনি বিলে মাছ ধরা উত্সব করেন করিমপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। এরূপ আটপৌরে মাছে-ভাতে বাঙালিয়ানার উত্সব মানিকগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাওর ও বিলগুলিতেও শত বত্সর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ইহার নামও আলাদা যেমন- ‘বাউতনামা’, ‘বাওয়াইত’, ‘হাইত’, ‘পলোবাওয়া’ ‘বাঁওড় দেওয়া’ ইত্যাদি। বর্ষার পানি সরিয়া গেলে (আশ্বিন-কার্তিকে) দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করিয়া এলাকার জোয়ান, বুড়া সকলেই পলো, ঠেলা জাল, খেওয়াজাল, চাবিজাল, ফাঁসিজাল, ধানজাল নিয়া এমনকি খালি হাতে মাছ ধরিতে নামিয়া পড়েন। মাতিয়া উঠেন উত্সবে। শহরপ্রবাসী গ্রামের ছেলেরাও আসিয়া যোগ দেন উত্সবে। বাঙালির পাতে যখন মাছের উপস্থিতি বিরল হইয়া উঠিয়াছে তখন দেশের বিল আর হাওড় এলাকায় মাছ ধরা উত্সবের খবর ও অপরূপ ছবিগুলি অনেকটাই রূপকথার গল্পের মতোন সংবাদপত্রে আসিয়া আমাদের গ্রামীণ শেকড়ের স্মৃতি জাগাইয়া চমকাইয়া দেয়। উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং সময়ের ব্যবধানে আমাদের চিরচেনা নদীগুলি শুকাইয়া ঊষর মরু হইয়া যাইতেছে। খাল-বিল কমিয়া আসিয়াছে, হাওর-বাঁওড়েও নেই আগের সেই উদ্দামতা। জনসংখ্যার চাপ আর বাণিজ্যিক স্বার্থে পুকুর-ডোবা, বিল-ঝিল হইতে হাওড়-বাঁওড় পর্যন্ত দিনে দিনে ভরাট হইতেছে। এমনকি জলজ্যান্ত নদীও এই দখল প্রক্রিয়ার বাহিরে নাই। মাছের চলাচলের ব্যবস্থা না রাখিয়াই অপরিকল্পিত বাঁধ আর রাস্তা নির্মাণ একদিকে যেমন মাছের প্রাকৃতিক আবাসের বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করিতেছে অন্যদিকে বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছ চাষ প্রযুক্তির প্রসার মাছের বৈচিত্র্যকে করিতেছে কোণঠাসা। উপরন্তু, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নদীতে ওয়াসা ও কলকারখানার বর্জ্য, শস্যে কীটনাশক ব্যবহার, মাছের প্রজনন স্থান ধ্বংস, ডিমওয়ালা মাছ নিধন, পোনা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ শিকার ইত্যাদি কারণে মুক্ত জলাশয়ে মাছের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাইতেছে। ইতোপূর্বে ৭০% মাছ উত্পাদিত হইত উন্মুক্ত জলাশয়ে এবং ৩০% অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে। বর্তমানে এর বিপরীত অর্থাত্ ৭০% মাছ উত্পাদিত হইতেছে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে এবং ৩০% উন্মুক্ত জলাশয়ে। যদিও, মত্স্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইন, ১৯৫০ এবং মত্স্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা বিধিমালা, ১৯৮৫ শুধুমাত্র মত্স্যকূলের সুরক্ষা নয়, ইহাতে উভচর প্রাণী এবং জলচর সরিসৃপ, ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মত্স্য শিকার, দূষণ এবং মাছের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম বন্ধ, মত্স্য শিকার নিষিদ্ধ করে মৌসুম ঘোষণার ক্ষমতা এবং অন্যান্য বিধি প্রণয়ন করিবার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে, তবু কার্যক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হইতেছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিতভাবে মত্স্য শিকারের কারণে অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলো দিন দিন মাছশূন্য হইতেছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মত্স্য অধিদপ্তর মত্স্য ব্যবস্থাপনাসহ প্রাকৃতিক মত্স্য সম্পদের ভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হইলেও সরাসরি জলমহালগুলি নিয়ন্ত্রণ করিবার ক্ষমতা তাহাদের নাই। কেননা জলাশয় ব্যবস্থাপনা ও দেখভালের দায়িত্ব ভূমি মন্ত্রণালয়ের। মত্স্য অধিদপ্তর শুধু প্রকল্প গ্রহণ করিতে পারে। আর এইসব প্রকল্পে প্রাকৃতিক মত্স্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং উহার প্রতিবেশ সংরক্ষণের চাইতে জোর দিতেছে উত্পাদন বৃদ্ধির উপর। অন্যদিকে, ভূমি প্রশাসনের নিকট জলমহাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকায় তাহারা রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তোয়াক্কাই করেন না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ইকোসিস্টেম। বিষয়গুলি সমন্বিত করিবার উপর জোর দিয়া মত্স্য অভয়াশ্রম স্থাপন এবং আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের বংশ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা জরুরি। তবেই আকাল কমিবে, মাছ ধরার পলো উত্সব জৌলুস ফিরিয়া পাইবে, মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদটির প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইবে।