একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি শক্ত হাতে অস্ত্র ধরে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এখন তরুণ প্রজন্ম দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ করছে। তারুণ্যের সাথে আছে ১৬ কোটি বাঙালি। এ যুদ্ধ বৃথা যেতে পারে না। বাঙালি মাথা নত করতে জানে না। একাত্তরে করেনি, ২০১৩তেও করবে না। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় নিয়েই ‘প্রজন্মযোদ্ধারা’ ঘরে ফিরবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে কিংবা রাজাকারদের সহায়তা করবে এমন সকল কর্মসূচি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, এখন প্রতিশোধ নিবে। জামায়াত যে হরতালের ডাক দিয়েছে তা প্রতিহত করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় নিয়েই ঘরে ফিরবে ‘গণযোদ্ধারা’। রাজাকারের ফাঁসির রায় নিয়েই উত্সব করবে। গতকাল বুধবার বিকালে ছয় দফা দাবিতে চলমান গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের ২৩তম দিনে মতিঝিলের মহাসমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেন মঞ্চের নেতারা। রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের সমাবেশের পর গতকাল বিকাল পৌনে চারটার দিকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ তৃতীয়বারের মতো শাহবাগের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কোরআন, গীতা, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে ধর্মীয় বাণী পাঠ করা হয়। এরপর সমবেত জনতা দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সমাবেশ থেকে আজ সকাল ১০টায় রাজধানীতে হরতালবিরোধী মিছিল এবং ট্রাইব্যুনালের সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেন মঞ্চের নেতারা।
গণজোয়ারে ভেসে গিয়েছিল মতিঝিলের অফিসপাড়া। অফিস ফেরত মানুষ এসে জমায়েত হয়েছিলেন গণজাগরণ মঞ্চে। গতকাল লাল-সবুজ পতাকা হাতে আর যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান মুখে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন মতিঝিল ও আশপাশের এলাকাবাসী। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের হাত ধরে এসেছিলেন শিক্ষার্থীরা। মা-বাবার সঙ্গে ছোট্ট শিশুরা যেমন এসেছিল, তেমনি এসেছিলেন শ্রমিক, রিকশাচালকসহ সর্বস্তরের মানুষ। বিকালে হাজার হাজার মানুষের এই সমাবেশ জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে সমাবেশে সভাপতির বক্তৃতায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, আমরা কোনো চাপ বা শক্তি প্রয়োগ করিনি, করছি না। আপনারা নিরপক্ষেভাবে বিচার কাজ চালিয়ে যান। ভয় পাবেন না। ১৬ কোটি জনতা আপনাদের সাথে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, একাত্তরের খুনি-হায়েনাদের শাস্তি যাবজ্জীবন হতে পারে না। আমরা ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। আজ রাতে (গত রাতে) আমরা প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান করব। আগামীকাল (আজ) ফাঁসির রায় নিয়ে বাড়ি ফিরব। উত্সব করব। ঘৃণা জানাই রাজাকারদের ও তাদের দোসরদের প্রতি। ইমরান এইচ সরকার বলেন, পাকিস্তানি হায়েনাদের নামে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান-স্থানের নাম এখনো বিদ্যমান থাকলে ঐ নাম গুঁড়িয়ে দিন। ছয় দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। আন্দোলন চলবে। আমরা অবিচল আছি।
জামায়াতের ডাকা হরতাল প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে। জামায়াত বিচারের বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে। ১৬ কোটি মানুষ রাজপথে বেরিয়ে তাদেরকে দেখিয়ে দিন, জামায়াতের নির্দেশ-হরতাল জনগণ মানবে না।
সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা যেভাবে প্রতিদিন কাজ করছেন, আগামীকালও (বৃহস্পতিবার) সেভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। ভ্রুক্ষেপ করবেন না রাজাকারদের কর্মসূচিতে। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের কোনো স্থান নেই। তাদেরকে বর্জন করুন। আজ সকল শিক্ষা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান যথারীতি খুলবেন এবং সকলে কাজে অংশগ্রহণ করবেন। জামায়াতের হরতাল আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। যাদের গাড়ি আছে তারা সবাই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হবেন। সড়ক পরিবহন চলবে।
ইমরান বলেন, জামায়াতের সাথে যারা বন্ধুত্ব রেখেছেন তাদেরকে ধিক্কার জানাই। যারা আমাদেরকে ভালোবাসা শিখতে বলেন, তাদেরকে বলতে চাই- আমাদের অগাধ ভালোবাসা আছে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের মানুষের প্রতি। আর রাজাকারের প্রতি রয়েছে ঘৃণা। নিজেদেরকে শোধরান। নইলে প্রত্যাখ্যাত হবেন। তিনি উপস্থিত জনতাকে নিয়ে শপথ পাঠ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। জামায়াতে ইসলামী এবং শিবিরকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। যুদ্ধাপরাধীদের ব্যবসায়িক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বয়কট করব। জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের গণমাধ্যম বয়কট করব। তিনি উপস্থিত জনতাকে নিয়ে শপথ পাঠ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। জামায়াতে ইসলামী এবং শিবিরকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। যুদ্ধাপরাধীদের ব্যবসায়িক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বয়কট করব। জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের গণমাধ্যম বয়কট করব।
মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে শরিয়া আইনেও তা সাংঘর্ষিক হবে না
মৃত্যুদণ্ড ছাড়া কাদের মোল্লার কোনো রায় হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ওলামা-মাশায়েখ ঐক্যপরিষদের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হালিম সিরাজী। একই সঙ্গে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ে তাকে ফাসি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার বিকালে মতিঝিল শাপলা চত্বরে গণজাগরণ সমাবেশে দেয়া বক্তৃতায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
আব্দুল হালিম সিরাজী বলেন, কাদের মোল্লা একাত্তরে মানুষ হত্যা করেছেন। তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় শরিয়া আইনেও সাংঘর্ষিক নয়। কোরআনেও বলা হয়েছে হত্যার বদলে হত্যা। অতএব যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ছাড়া অন্য কিছু মানবো না। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসি দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ব্লগার রাজীব হায়দারকে ধর্ম ব্যবসায়ীরা খুন করেছে। এখন তারাই রাজীবকে নিয়ে কুত্সা রটাচ্ছে।
সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ধর্ম ব্যবসায়ী জামায়াত-শিবির ১৯৭১-এ অনেক অপপ্রচার চালিয়েছে। একাত্তরে তারা বলেছিলো ইসলাম গেলো। যখন তা ধোপে টেকেনি, তখন তারা বলেছে এটা ভারতের আন্দোলন। এক পর্যায়ে তারা বলেছিলো, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হচ্ছে। একইভাবে এখনো যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন নিয়েও অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’ জনগণ গিলবে না।
জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির বলেন, সাঈদীর মামলার রায়ে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতিফলন না হলে আরেকটি ৫ ফেব্রুয়ারির জন্য প্রস্তুত থাকবেন। আগামীকালের (আজকের) রায়ে যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না হয় তাহলে রাজপথ ছাড়া হবে না। সাইদীর ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো রায় মানব না।
ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্যবসু বলেন, দেশের কোনো আইন, রায়, আদালত যদি জনগণের রায়কে না মানে তবে তা বৃথা যাবে। জনরায়কে ধারণ করে বিচার করুন। জনগণের রায়, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সাইফুজ্জামান সাকন, বিপ¬বী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি আবদুর রউফ, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক, ছাত্র ঐক্য ফোরামের সভাপতি সোহান সোবহান, ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মঞ্জুরুর রহমান মিঠু, ছাত্র সমিতির যুগ্ম-আহ্বায়ক সালমান খান।
এর আগে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে ছাত্র-তরুণ-জনতা মতিঝিলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। মত্স্য ভবন, প্রেস ক্লাব, দৈনিক বাংলা হয়ে মিছিলটি মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশশেষে একই পথ ধরে সন্ধ্যায় শাহবাগে ফিরেন আন্দোলনরতরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আন্দোলনরতরা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত রাখেন শাহবাগ।
হরতাল বিরোধী মিছিল ও ট্রাইব্যুনালের সামনে সমাবেশ
জামায়াতে ইসলামীর ডাকা আজকের হরতাল প্রত্যাখ্যান করে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। হরতাল প্রতিহত করতে আজ সকাল ১০টায় একটি মিছিল বের করবে মঞ্চ। মিছিলটি প্রেস ক্লাব, দৈনিক বাংলা, মতিঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে বলে মতিঝিলের সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়া আজ ট্রাইব্যুনালের সামনে অবস্থান নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরতরা।
থেমে নেই শাহবাগ
মতিঝিলে সমাবেশ হলেও শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেমে নেই। এখানে নিরন্তর শ্লোগান চলছেই। গতকালও শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর ছিল প্রজন্ম চত্বর। মতিঝিলের সমাবেশের কারণে মানুষের আনাগোনা কম থাকলেও তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মানুষের কমতি বুঝতে দেয়নি। সড়কের একপাশে জমায়েত হয়ে সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা। সন্ধ্যায় সমাবেশ শেষ হওয়ার পর শাহবাগে জমায়েত বাড়তে থাকে। রাতে হাজারো জনতা দাবি আদায়ে শ্লোগান তোলেন। সময়ভেদে জমায়েত হওয়া মানুষের সংখ্যা কম-বেশি হলেও দিন রাত ২৪ ঘণ্টাই জাগ্রত রয়েছে শাহবাগ। এর আগে গতকাল দুপুরে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মতিঝিলের দিকে যাত্রা করেন আন্দোলনরতরা। যাওয়ার পথে শ্লোগান, প্ল্যাকার্ড, পোস্টারের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন তারা। এদিকে গতকাল প্রায় ২৫ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছে বলে জানিয়েছে প্রজন্ম চত্বরের মিডিয়া সেল।
