‘বিশ্বায়ন’ বর্তমানে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বিশ্বের ধনী এবং দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক এবং সাহায্য সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে—এ প্রত্যয় এবং আশা নিয়ে বিশ্বায়নের প্রসার ঘটলেও বাস্তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। এর মূল কারণ পুঁজিবাদ। অবাধ নীতির কারণে পুঁজিবাদের প্রসার যেভাবে ঘটেছে তাতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্র সমান সুবিধা ভোগ করতে পারছে না।
বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার সিংহভাগ সুফল ভোগ করছে পুঁজিবাদী উন্নত রাষ্ট্রগুলো। বিশ্বায়ন ধারণার সুযোগ নিয়ে পুঁজিবাদ বিজয়ী বেশে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ সুবিধা থেকে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো বঞ্চিতই বলা যায়। উন্নতশীল দেশগুলোও এর সুফল পাচ্ছে না। বলতে গেছে পুঁজিবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলো এর সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। একদিকে মনে হচ্ছে পুঁজিবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলো দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করছে। আসলে শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো সাহায্য-সহযোগিতার নামে দরিদ্র দেশগুলোর সহজ প্রাপ্য সস্তা শ্রমকে শোষণ করছে।
বিশ্বজনীন উন্নয়ন কৌশল গরিব দেশগুলোর লোকদের জন্য অধিকতর চাকরির সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু একই সময়ে এটি উচ্চহারে মুনাফারও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। এ ব্যবস্থা স্থায়ী দারিদ্র্যের পথকে সুগম করে দিচ্ছে যাতে পুঁজিবাদীরা দরিদ্র দেশ থেকে সস্তা শ্রম অনবরত টানতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশের শোষিত এবং দরিদ্র কর্মীরা বিশ্বায়ন নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিশালী পুঁজিবাদের সমকক্ষ নয়। ফলে সম্পদ এবং দারিদ্র্যের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো তাদের ভিত্তি মজবুত করে নিজস্ব সত্তায় দাঁড়াতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তিসহ কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলো সহযোগিতা পেলেও তাদের মৌলিক অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বায়ন বিশ্বের লোকগুলোকে একই জাহাজে কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণির কেবিনে পৃথক করে রেখেছে। খুব অল্পসংখ্যক লোক আধুনিক বিলাসবহুল কক্ষে ভ্রমণ করছে। তাদের জন্য রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্যের এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। নিশ্চয়তা রয়েছে উন্নত চিকিত্সাব্যবস্থা এবং বিলাস বহুল জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক জনগণ তৃতীয় শ্রেণির কামরায় ভ্রমণ করছে এবং ক্ষুধা ও রোগে ভুগছে।
দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো কঠিন শর্তে ঋণ গ্রহণ করে ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। তারা বিশ্বায়নের বাইরের আবরণের চাকচিক্য দেখছে কিন্তু ভেতরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধনী রাষ্ট্রগুলো গরিব রাষ্ট্রগুলোকে সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা ভোগের ব্যবস্থা করে দিলেও স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
বিশ্ব বাণিজ্যের সুবিধা সকল রাষ্ট্র সমানভাবে ভোগ করতে পারলে বিশ্বের সুবিধা সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারবে। অর্থাত্ বিশ্বায়ন সবার জন্য সুখ আনতে পারবে তখনই যখন একই জাহাজের সকল যাত্রী একটি শ্রেণির কেবিনে ঐক্য, সাম্য ও ন্যায়ের শর্তে ভ্রমণ করতে পারবে। কিন্তু পুঁজিবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলো তা কি কখনো হতে দেবে? দেবে না। দেবে না এজন্য যে, তাহলে তাদের প্রাধান্য বিশ্বে কমে যাবে। অথচ বিশ্বে সকল মানুষের নিরাপত্তা, সুখ ও শান্তিই বিশ্বায়নের মূল স্লোগান হওয়া উচিত।
টাঙ্গাইল
