ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৮
একাত্তরের দোসরা মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ছাত্রসমাবেশে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয়। লাল, সবুজ, সোনালী তিন রঙের পতাকাটি সেই যে বাংলার আকাশে উড়লো তা আর নামাতে পারেনি পাকিস্তানের সুসজ্জিত সেনাবাহিনী ও সরকার। সে সময় ‘জয় বাংলা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’-মার্চে বাংলার আকাশ বাতাস শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল। দিকে দিকে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো শুরু হয়। আর এই সময়টাকেই ছাত্রনেতারা বেছে নেন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তর করার মোক্ষম মুহূর্ত হিসাবে। এর আগে ১৯৬৯ সালে ১১ দফা আন্দোলন চলার সময় ছাত্রলীগের নেতারা গোপনে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তুলেন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশা নিয়ে সে সময়ই চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বিশাল সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি আ স ম আব্দুর রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ প্রসঙ্গে নূরে আলম সিদ্দিকী তার ‘পহেলা থেকে ২৫ মার্চ’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বলেছেন, ‘২৫ মার্চের পর কিছু নেতা এবং উপনেতা আমাদের ওপর রুষ্ট হয়ে দীর্ঘ ন’মাস প্রচার করেছেন যে, আমরা ভাবাবেগে বা উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে স্বাধীনতার পতাকা তুলে নেতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছি। আজ তারা বাস্তবতাকে আঁচ করতে পেরেছেন বলেই আমার মনে হয়। এই বেচারারা বড় অসহায়। এরা (বঙ্গবন্ধু) নেতাকে উপলব্ধি করতে পারতেন না। এদের দোষ নেই। সেদিন পল্টনে আসবার আগে নেতা আমাকে কি বলেছিলেন, আমাদের ওপর নেতার সার্বিক কি নির্দেশ ছিল—ওদের তা জানার কথা ছিল না। তবু এই অপপ্রচার বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। তবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের দৃঢ়তায় এসব বিভ্রান্তি কেটে যায়। ২ তারিখে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে যে সভা হয়েছিল তা শুধু আয়তনের বিচারেই নয় গুরুত্বের বিচারেও ছিল ঐতিহাসিক। কারণ ওইদিনই স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয়।’ সেই পতাকা উত্তোলনের মুহূর্তেই ছাত্ররা বুঝে নিয়েছিল ‘যুদ্ধ অনিবার্য’। সেদিন সচিবালয়েও পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা পতাকা উড়ানো হয়। সেদিন রাতে হঠাত্ করে বেতার মারফত ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। কারফিউ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও শ্রমিক এলাকা থেকে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা প্রবল শ্লোগান তুলে কারফিউ ভেঙে মিছিল বের করে। শ্লোগান ছিল : ‘সান্ধ্য আইন মানি না’, ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। সমস্ত শহরে কারফিউ ভঙ্গ করে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। ডিআইটি এভিনিউয়ের মোড়, মর্নিং-নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে নয়টায় সামরিক বাহিনী জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। মানুষের বিশাল মিছিল কারফিউ ভঙ্গ করে গভর্নর হাউজের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও গুলি চালানো হয়। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চলে।