জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ করে পুরো চট্টগ্রামজুড়ে আতংক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নগরী ও জেলার বিভিন্ন রাস্তায় জনসমাগম ও যান চলাচল ছিল খুবই কম। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। জামায়াত-শিবিরের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার, বান্দরবান জেলার অন্তত ২০টি রুটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির কর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে দিনভর অবস্থান করেছে। সাঈদীর রায় ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার বাঁশখালী উপজেলায় বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি ভবনে জামায়াত-শিবিরের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। গতকালও সেসব ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। গতকাল জুমার নামাজের পর থেকে স্থানীয় জামায়াত কর্মীরা সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীরহাট এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করে। সীতাকুণ্ড উপজেলায় জামায়াতের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা তিনটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করেছে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওই এলাকায় কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
গতকাল জুমার নামাজের পর নগরীর আন্দরকিল্লা মসজিদ থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি আন্দরকিল্লা থেকে সিরাজুদ্দৌলা রোড হয়ে চকবাজার এলাকায় সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এবং জামায়াতের মহানগর আমির মু. শামসুল ইসলাম। মিছিলকারীরা কয়েকটি গাড়ি, আশপাশের কয়েকটি দোকানপাট ও শোরুমের গ্লাস ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দিতে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে বেধে যায় সংঘর্ষ। এতে চার পুলিশসহ সাত জন আহত হয়। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন কনস্টেবল নাসির উদ্দিন, মো. রাশেদ, মো. সাইফুল ও মো. সোলায়মান।
সমাবেশ শেষে জামায়াত কর্মীরা চকবাজার এলাকায় ককটেল ফাটিয়ে আতংক সৃষ্টি করে। এ সময় পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জামায়াত কর্মীরা দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার কপিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার সাঈদীর রায় ঘোষণার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা ব্যাপক হামলা ও ভাংচুর চালায়।
বাঁশখালী সংবাদদাতা জানান, বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবির ও বিক্ষুব্ধ জনতার দেয়া আগুনে আদালত ভবন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, পৌরসভা ভবন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের কার্যালয়সহ শত শত যানবাহন, ব্যাংক বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বলছে। আগুন দেয়া হয়েছে উপজেলা সদর জামে মসজিদে, হিন্দুদের ঘর বাড়ি ও মন্দিরেও। তবে মাইকে আহবান করার পর উপজেলা সদর জামে মসজিদের আগুন জনতা এগিয়ে এসে নিয়ন্ত্রণে আনে। দক্ষিণ জলদী মহাজনপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসা শীলকূপ ইউনিয়নের নাথপাড়া এলাকার সাঁচি হরির ছেলে দয়াল হরিকে (৫০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় বেপরোয়া হামলায় ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিকালে কয়েক হাজার সশস্ত্র নেতা-কর্মীর মিছিল থেকে একের পর এক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আগুন, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হলেও পুলিশ কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এ সময় দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে আসা হাজার হাজার জনতার মিছিল থেকে বাঁশখালী থানায় আগুন দেয়ার চেষ্টা চালালে পুলিশ ভেতরে অবস্থান নিয়ে গুলিছুঁড়ে। বাইরে থেকে জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পযর্ন্ত টানা সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা বাঁশখালীতে পৌঁছলে জামায়াত-শিবির কর্মীরা পিছু হটে। বিনা বাধায় বাঁশখালী উপজেলা সদরে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা ও ভাংচুরে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ সময় অনেককে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট করে মালামাল নিয়ে যেতে দেখা যায়। ঘটনার পর থেকে বাঁশখালীতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বাঁশখালীর পরিস্থিতি এখনো থমথমে। গতকাল শুক্রবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন মামলা রুজু না হলেও একাধিক মামলা রেকর্ড হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী থানার ওসি আবদুস সবুর। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মন্নান, জেলা পুলিশ সুপার কেএম হাফিজ আক্তার শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
লোহাগাড়া সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বটতলী মোটর স্টেশনে বৃহস্পতিবার সারাদিন দফায় দফায় জামায়াত-শিবিরের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে পুলিশসহ নিহত হয়েছে ২ জন। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। হরতাল চলাকালে সাঈদীর রায় ঘোষণার পর পিকেটাররা উপজেলার বটতলী মোটর স্টেশনে ব্যাংক, মার্কেট, দোকান, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পরিষদ অফিসে ব্যাপক ভাংচুর করে। ওই সময় পিকেটাররা হানিফ পরিবহন সার্ভিসের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। হামলার শিকার হয় লোহাগাড়া মা-মণি হাসপাতাল, বেস্ট চৌধুরী প্লাজা, মোস্তফা সিটি, ব্যাংক এশিয়া, ওয়ালটন শো-রুম, সোনালী ব্যাংক, ইউসিবিএল, লিয়াকত মার্কেট, গোল্ডেন সিটি কমিউনিটি সেন্টার, ডা. সিরাজ উদ্দীন শপিং সেন্টার ও লোহাগাড়া শপিং সেন্টার। হরতাল সমর্থকরা ব্যাংক এশিয়া, এবি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথ ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জিপ চালক মিজবাহ উদ্দিন (১৮) ও পুলিশ কনস্টেবল তারেক হোসেন নিহত হয়। আহত হয় অর্ধশতাধিক সাধারণ মানুষ ও জামায়াত-শিবিরকর্মী। লোহাগাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহজাহান, এসআই শরিফ, নজরুল, আওয়াল, নূরুল ইসলামসহ ৪ কনস্টেবল আহত হয় বলে জানা যায়। বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দূরপাল্লার যানবাহনসহ উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের যানবাহন চলাচলও বন্ধ রয়েছে।
সাতকানিয়া সংবাদদাতা জানান, বৃহস্পতিবার হরতাল চলাকালে জামায়াত-শিবির কর্মীরা ২ শতাধিক দোকান, ২টি ক্লিনিক ও কমপক্ষে ৮০টি গাড়ি ভাংচুর করে। বিক্ষুব্ধ জামায়াত কর্মীরা ৭/৮টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভান।
সীতাকুণ্ড সংবাদদাতা জানান, সীতাকুণ্ডে সাঈদীর রায় ঘোষণাকে কেন্দ করে গতকাল শুক্রবার বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের তিনটি স্থানে তিনটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে সকাল ৯টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। যাত্রীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর আগে সাঈদীর ফাঁসির রায়ের খবর শোনার পর বৃহস্পতিবার থেকেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে উপজেলার সর্বস্তরের জনতা। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় সিরাজ ভুঁইয়া রাস্তার মাথায় ১টি, সীতাকুণ্ডে হাসপাতালের উত্তর পাশে ১টি ও পৌর সদর দক্ষিণ বাইপাসে ১টিসহ মোট ৩টি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দিলে ট্রাকগুলো পুড়ে যায়। এতে যানজটে যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালামাল খালাসের পর মালবোঝাই ট্রাকগুলো গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে না পারায় চরম শংকায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ সামিউল ইসলাম বলেন, অবরোধকারীরা সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে বেশকিছু গাড়িতে আগুন ও ভাংচুর চালায়। বর্তমানে অবরোধকারীদের হটিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। হরতালে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও ব্যারিকেড দেয়ার অভিযোগে ১৩৭ জনের নাম উল্লে¬খ করে ও অজ্ঞাত আরো ৮৫০ জনের বিরুদ্ধে থানায় ৩টি মামলা হয়েছে।
