[ রা জ নী তি ]

জামায়াতি হরতালে যুক্ত হয়ে বিএনপি লাভবান হবে কি?

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৮
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেন যখন নািস জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, তখন দুটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট ও বিএনপি (ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) ফ্যাসিবাদকে সমর্থন জানিয়ে নিজ দেশে ফ্যাসিবাদী তত্পরতা শুরু করেছিল। তদানিন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল তখন বলেছিলেন, ‘কখনো কখনো কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বা দলসমূহকে, এমনকি কোনো কোনো জাতিকেও সামগ্রিক পাগলামিতে (collective madness) পেয়ে বসে। ব্রিটেনের দুটি ফ্যাসিস্ট দলকেও এই কালেকটিভ ম্যাডনেস পেয়ে বসেছে।’ ব্রিটেনে এই ফ্যাসিস্ট দল দুটিকে কঠোরভাবে তখন দমন করা হয়েছিল। ব্রিটিশ জনগণও এদের উত্থান প্রতিহত করেছে। বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চলমান ঘটনায় মনে হয়, অতীতের ব্রিটেনের মতো বর্তমানে বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক দলকেও কালেকটিভ ম্যাডনেসে পেয়ে বসেছে। এই দুটি দল হলো জামায়াত এবং বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি)। যুদ্ধকালীন ব্রিটেনের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের ঘটনার পার্থক্য এই যে, তখনকার উল্লেখিত দুটি রাজনৈতিক দলই ছিলো ফ্যাসিবাদী। বাংলাদেশের ন্যাশনালিস্ট বা জাতীয়তাবাদী দলটি ফ্যাসিবাদী দল নয়, বরং গণতান্ত্রিক দল হিসাবে পরিচিত। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুটি দলই একই ধরনের কালেকটিভ ম্যাডনেসে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ দেখাচ্ছে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ঘোষিত শাস্তি বানচাল করার লক্ষ্যে জামায়াত আজ এবং আগামীকাল (রবিবার ও সোমবার) সারাদেশে হরতাল ডেকেছে। জামায়াতের ডাকে হরতাল হয় না, এটা গত বৃহস্পতিবারে (২৮ ফেব্রুয়ারি) ডাকা হরতালেও প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকায় উত্পাত সৃষ্টি করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি দু’দিন জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারেরা ভাঙচুর অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অকালে চল্লিশের বেশি প্রাণ ঝরিয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশও আছে। এতো ভাঙচুর, প্রাণহানি এবং এক স্থানে রেললাইনের ফিসপ্লেট তুলে ফেলেও কোথাও হরতাল সফল করা যায়নি। সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসের ভয়ে অনেক স্থানে রাস্তায় গাড়ি বের করেনি, দোকানপাট খোলেনি, ফলে বর্তমানের ঢিলেঢালা শিথিল হরতালকেই সফল হরতাল বলে জামায়াত-বিএনপির মিডিয়াগুলো চালানোর চেষ্টা করেছে। সন্দেহ নেই, আজ এবং আগামীকাল (রবি ও সোমবার) দেশে একই কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। অর্থাত্ জনসমর্থন বঞ্চিত ভয়তাল পালিত হতে পারে। তবে জামায়াতিদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। আমার মতে, এই পকেট সন্ত্রাস দ্বারা সরকারের পতন ঘটানো যাবে না, কিংবা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের বিচার ও শাস্তিদানও বন্ধ করা যাবে না। নাগরিক জীবনের ভোগান্তি বাড়ানো হবে মাত্র। এসব কথা জানা থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসেই বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের রবি ও সোমবারের হরতালের সঙ্গে যুক্ত করে তৃতীয় দিন অর্থাত্ মঙ্গলবারেও (৫ মার্চ) দেশে হরতাল ডেকেছেন, একে কালেকটিভ ম্যাডনেস ছাড়া আর কী আখ্যা দেব? বিএনপি নেতারা এতোদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর তত্পরতায় জামায়াতিদের নানাভাবে সাহায্য ও সমর্থন জুগিয়ে এলেও মুখে বলেছেন, তারা জামায়াতিদের সঙ্গে নেই। এখন জামায়াতিদের ডাকা হরতালের সঙ্গে নিজেদের হরতাল যুক্ত করে প্রমাণ করলেন, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জামায়াতি তত্পরতা ও চক্রান্তে সম্পূর্ণভাবে জড়িত। জামায়াতের বর্তমান সন্ত্রাসী রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার যে মুখোশ এতোদিন বিএনপি ধারণ করেছিল, দলনেত্রী সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে নিজেই সেই মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দলটির আসল রূপ দেখালেন। দেশব্যাপী জামায়াতি সন্ত্রাসের পরিণতিতে যে মৃত্যু ঘটেছে তাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে সব দোষ সরকারের উপর চাপিয়েছেন এবং গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো জামায়াতের দুইদিন ডাকা হরতালের সঙ্গে নিজেদের তৃতীয় দিনের হরতালটি যুক্ত করেছেন। দুই দলের যৌথ পাগলামির প্রমাণ তাতে আরও স্পষ্ট হলো। বিএনপি নেতারা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখেন না। গত তিন চারদিন ধরে বাংলাদেশে যা চলেছে, তা কোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলন নয়, পূর্ব ঘোষিত ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু করার জন্য জামায়াতের সশস্ত্র সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসের মুখে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারই নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। সন্ত্রাসীরা চার-পাঁচজন পুলিশকেও হত্যা করেছে। নিরীহ বাসযাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। থানা ফাঁড়ি লুট করেছে। এই সন্ত্রাস দমন যদি গণহত্যা হয় তাহলে গ্রামের নিরপরাধ চাষীরা সার সরবরাহের জন্য শান্তিপূর্ণ মিছিল করে বিএনপি সরকারের আমলে দাবি জানাতে এসে একদিনে ১৮ জন কৃষককে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হলো, সেটা কি ধরনের হত্যাকাণ্ড ছিলো? ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াত সারা বাংলাদেশে যে যুদ্ধাবস্থা (৭১-এর অসমাপ্ত যুদ্ধ) সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে, সে সম্পর্কে জামায়াত ও বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকা (১ মার্চ শুক্রবার) পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন। ‘এটা জামায়াতিদের অসংযত প্রতিক্রিয়া।’ সত্য কথনে ‘ইকোনমিস্টের’ আগ্রহ থাকলে তারা বলতেন, এটা হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া। তবে বিলেতের সবচাইতে প্রতিক্রিয়াশীল পত্রিকাটিও স্বীকার করেছেন শাহবাগের গণআন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। বাংলাদেশের সচেতন মানুষ জানে, এই শান্তিপূর্ণ গণজোয়ারকে হিংসার পথে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য জামায়াতিরা নিজেরা সন্ত্রাস চালিয়ে বহু উস্কানি দিয়েছে। জামায়াতের ভাড়াটিয়া বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলনকে ফ্যাসিস্ট এবং ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে বহু প্রচার চালিয়েছে। একজন ব্লগারকে নির্মমভাবে কুপিয়ে মারা হয়েছে। তথাপি জামায়াতের উস্কানির ফাঁদে প্রজন্ম স্কোয়ারের যুবজনতা পা দেয়নি। এখানেই জামায়াতের বর্তমান তথাকথিত আন্দোলনের নৈতিক পরাজয় ঘটে গেছে। এই পরাজয় ঢাকার জন্য তারা এখন আরও ব্যর্থ হরতাল ডাকবে, আরও রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাস চালাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু জয়ী হবে না। একাত্তরে হানাদারদের গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যায় শরিক হয়ে তারা সফল হয়নি। বরং তাদের পালের গোঁদাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিলো। বর্তমানে বাংলাদেশ স্বাধীন এবং দেশের মানুষ জাগ্রত। শাহবাগের অভাবিত গণউত্থান তার প্রমাণ। সন্ত্রাস দ্বারা গণউত্থান রোখা যায় না। বর্তমান সরকার এই গণউত্থানের জোরেই ’৭১ এর ঘাতকদের চরম দণ্ডদানের ব্যবস্থা করতে সাহসী হয়েছেন। ব্যর্থ বা শিথিল হরতাল ডেকে, আরও ভয়ানকভাবে ভাঙচুর, রক্তপাতের সন্ত্রাস চালিয়ে বিচার বন্ধ করা যাবে না, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দান থেকেও সরকার অথবা ট্রাইব্যুনালকে হটানো যাবে না। হয়তো আরও কিছুদিন জামায়াতি সন্ত্রাস চলবে। সরকার কঠোর থাকলে এই সন্ত্রাস ভারতের আরও ভয়াবহ নকশালি সন্ত্রাসের পরিণতি বরণ করবে। সন্ত্রাস দ্বারা যেখানে কোনো মহত্ উদ্দেশ্যই সাধন করা যায় না, সেখানে জামায়াতিরা সন্ত্রাস দ্বারা কি করে একটি অসত্ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি করবে? বিএনপি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং গণতান্ত্রিক দল বলেও পরিচিত। তারা জেনেশুনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো একটি সর্বসম্মত জাতীয় দাবির বিরুদ্ধে কি করে জামায়াতের অবস্থানের পক্ষে গিয়ে দাঁড়ালেন তা ভাবতে বিস্ময়বোধ করছি। এটা কি বিএনপি’র রাজনৈতিক ডেথউইশ? বেগম জিয়া কি তার দুই পুত্রকে দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা এবং দলীয় নেতৃত্বে বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠার জন্য এতোই উদগ্রীব যে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থ এবং বর্তমান রাজনীতির বাস্তবতা তিনি বিস্মৃত হতে পারেন? ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি আজ (রবিবার) বাংলাদেশ সফরে আসছেন। থাকবেন তিন দিন, আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশে তার শ্বশুর বাড়িতেও ৪০ মিনিটের জন্য বেড়াতে যাবেন। বাংলাদেশে তার এই তিন দিনের অবস্থানের সময়েই জামায়াত দু’দিনের এবং বিএনপি একদিনের হরতাল ডেকেছে। ভারতের রাষ্ট্রপতির পূর্ব ঘোষিত এই তিন দিনের সময়ের তারিখ এড়িয়ে জামায়াত ও বিএনপি তাদের হরতাল ডাকতে পারতো। তা না করে ভারতের রাষ্ট্রপতির সফরকালীন এই হরতাল কী ইংগিত দেয়? জামায়াতের ভারত বিদ্বেষ ও বিরোধিতা সকলের জানা, কিন্তু বিএনপি-নেত্রীতো এই সেদিন দিল্লি সফরে গিয়ে তাদের ভারত-বিরোধিতার নীতি বর্জনের ঘোষণা দিয়ে এসেছেন। তারপর দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও দেশের স্বার্থ এবং সকল কূটনৈতিক শিষ্টতা বিসর্জন দিয়ে বৃহত্ প্রতিবেশীর রাষ্ট্রপতির প্রতি এই অসৌজন্যতা প্রদর্শন কি দেশের জন্য এবং তার দলের জন্যও মঙ্গলজনক হবে? সম্ভবত: এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হয়েই বেগম জিয়া একদিকে হরতাল ডেকেছেন এবং অন্যদিকে তাদের দুই দলের এই হরতাল চলাকালীন সময়েই হরতাল ভেঙে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে দেখা করতে ছুটবেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটা দু’কূল রক্ষার কৌশল। তাতে বিএনপি সফল হবে কি? জামায়াতের এই সন্ত্রাসের সাম্প্রদায়িক চেহারাটিও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর লুটপাট হচ্ছে, তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শনিবার সকালে (লন্ডন সময়) এই লেখাটি শেষ করে আনার মুহূর্তে খবর পেয়েছি, সাতকানিয়ায় (চট্টগ্রাম) তিনজন নিহত হয়েছে এবং সিলেটেও উপদ্রব সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। ঢাকায় গোলযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। এই জামায়াতি সন্ত্রাসের সঙ্গে বিএনপি যুক্ত হতে গেলে দলটির জনসমর্থন বাড়ার স্থলে গুরুতরভাবে কমবে। এমনও খবর পেয়েছি, বিএনপির ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক যে সাধারণ নেতা-কর্মী আছেন, তারা একযোগে দলত্যাগ করে অন্য দলে যোগদান অথবা নতুন দল গঠন করতে পারেন। দেশের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত, একথা আমি বলি না। বরং বলবো, এতোদিনের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ একটা নিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। এই নিশ্চয়তাটি হলো একাত্তরের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তির দিকে এগুনো। এই অবস্থায় সংঘাত ও রক্তপাত হবেই। একাত্তরের পরাজিত চক্র তাদের শেষ পরাজয় এড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে শেষ ছোবল হানবেই, সরকার কঠোর হলে এবং কঠোর থাকলে জামায়াতিদের এই বিষদাঁত ভেঙে ফেলা অসম্ভব হবে না। দেশময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবার জেগে উঠেছে। আমার বিশ্বাস, এই চেতনার সংঘবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রতিরোধের সামনে একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা এবার চূড়ান্তভাবে পরাজিত হবে। \ লন্ডন ২ মার্চ, শনিবার, ২০১৩ \