নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলার মানুষ পেয়েছে মানচিত্র আর আকাশ পেয়েছে লাল-সবুজ পতাকা। সেই পতাকা এ জাতির সম্মান ও সফল সংগ্রামের প্রতীক। সেই জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে জামায়াত-শিবির। আগুনে পুড়েছে জাতীয় পতাকা। জাতীয় পতাকার এ অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়েছে তারুণ্য। গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে দেশের সকল সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এবং যানবাহনে পতাকা উড়িয়েছে শিক্ষার্থী-তরুণ-যুবসহ সর্বস্তরের মানুষ। ‘জীবন দিয়ে হলেও পতাকার মান রাখার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা। একইসাথে দেশ জুড়ে সহিংসতা প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন অবস্থান নিতে আহ্বান জানিয়েছে মঞ্চ।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে শনিবার দেশের সব সরকারি, বেসরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বাস, ট্রাক, লঞ্চ, নৌকা, মোটর সাইকেলসহ সবধরনের যানবাহনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পূর্বনির্ধারিত সেই কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল শনিবার শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। মঞ্চের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল সাড়ে ১১টায় জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। এ সময় তার সাথে ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদসহ বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। পতাকা উত্তোলনের পর সমবেত জনতা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত রাখেন প্রজন্ম চত্বর। এ সময় ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, জামায়াত-শিবিরের ‘হায়েনারা’ দেশে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, জাতীয় পতাকা ছিঁড়েছে, তা নজীরবিহীন। এই বাংলায় কোনো রাজাকারের ঠাঁই নেই। তারা পতাকা পুড়িয়েছে-ছিঁড়েছে। এখন দেশের ১৬ কোটি মানুষ পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। জনতা জামায়াত-শিবিরকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এবার প্রতিরোধ করবে।
রবি-সোম-মঙ্গলবারের হরতাল প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়ে ইমরান বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ তাদের হরতাল প্রত্যাখ্যান করছে। বিএনপির হরতাল ডাকা দুঃখজনক। আমরা তাদের এই হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানাই। হরতাল প্রত্যাখ্যানে আজ রবিবার সকাল ১০টায় গণজাগরণ মঞ্চ থেকে গণমিছিল বের হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভবন, হল, ইনস্টিটিউটে পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন ভবনে ও সড়কে বাস, মাইক্রোবাস, মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে পতাকা উড়তে দেখা যায়।
জানা গেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সংহতি জানিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে সচিবালয়সহ দেশের সরকারি-বেসরকারি-আধা সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত সকল প্রতিষ্ঠানে।
বিক্ষোভ সমাবেশ :এদিকে জাতীয় পতাকার অবমাননা ও জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের প্রতিবাদে মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মঞ্চের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মধুর ক্যান্টিন থেকে মিছিল শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। অপরদিকে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গতকাল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেন বলেও জানা যায়।
পুরান ঢাকায় আজ সমাবেশ :গত ২১ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে ছয় দফা দাবিতে ১২টি কর্মসূচি ঘোষণা করে গণজাগরণ মঞ্চ। এ কর্মসূচি অনুযায়ী আজ রবিবার বিকাল তিনটায় পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে মঞ্চের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সমাবেশে সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার :সম্প্রতি রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সংঘর্ষ-সহিংসতার কারণে গণজাগরণ মঞ্চের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। তিন স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। র্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গণজাগরণ মঞ্চে সর্বোচ্চ সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। গত কয়েকদিন শাহবাগ মোড়ের কাঁটাবন, রূপসী বাংলা ও মত্স্য ভবনমুখী সড়ক দিয়ে যান চললেও গত শুক্রবার থেকে আবারো যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মোড়ের চারদিকের সড়কেই বেষ্টনী তৈরি করে র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী চেকিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে প্রজন্ম চত্বরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। তবে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালগুলোর অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যান চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে।
