শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী এবং ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) শুক্রবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ (২২) , মাকসুদুল হাসান অনিক (২৩), এহসান রেজা রুম্মান (২৩), নাঈম সিকদার ইরাদ (১৯) ও নাফিস ইমতিয়াজ (২২)। তারা সবাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের ছাত্র। গতকাল ডিবি পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। তারা বলেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাইয়ের (যিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা) নির্দেশেই ব্লগার রাজীবকে হত্যা করা হয়। গতকাল শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন “ঈমানি দায়িত্ব’’ পালনের জন্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা বলেছে গ্রেফতারকৃতরা। তবে পরিকল্পনকারী ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, ঐ ব্যক্তি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এক নেতা। তাকেসহ দুইজনকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
নির্দেশ দাতা বড় ভাই : ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানান, তারা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামাজ কক্ষে নামাজ পড়তে গিয়ে একে অপরের সাথে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হন। সেই সূত্রে তারা ইসলামিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং ইন্টারনেট হতে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করতেন। তাদের গ্রুপের এক বড় ভাই (যিনি একসময় বাংলাদেশ ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন) তাদেরকে ইন্টারনেটের বিভিন্ন ব্লগের ঠিকানা দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তারা থাবা বাবাসহ বিভিন্ন ব্লগারের লেখার সাথে পরিচিত হন এবং একপর্যায়ে থাবা বাবা সম্পর্কে রটানো বিভিন্ন গুজবে বিশ্বাস করে ‘থাবা বাবা নামধারী’ ব্লগারকে শনাক্ত করে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য পরিকল্পনা করেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পল্লবীর পলাশনগরের নিজ বাসার সামনে রাজীবকে চাপাতি দিয়ে হত্যা করেন।
রাজীবকে শনাক্ত : গ্রেফতারকৃতরা জানান, আলোচনা সাপেক্ষে ব্লগার রাজীবকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। তারা রাজীবকে ব্লগে এবং ফেসবুকে এ ঢুকে রাজীব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। শাহবাগ গণজাগরণ আন্দোলন শুরু হবার পর তারা রাজীবের ফেসবুকের স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারেন রাজীব শাহবাগে যাবেন। এরপরই তারা তাকে শনাক্ত করার জন্য দুইটি গ্রুপ তৈরি করেন। একটি ইনটেল গ্রুপ ও অপরটি এক্সিকিউশন গ্রুপ। ইনটেল গ্রুপ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। এ গ্রুপে এহসান রেজা রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম সিকদার ইরাদসহ আরও দু’জন । এক্সিকিউশন গ্রুপে ছিলেন ফয়সাল বিন নাঈম, মাকসুদুল হাসান অনিকসহ আরও একজন।
গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানান, ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা গত ৯ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ যায়। তারা থাবা বাবা নামধারী ব্লগার রাজীবকে খোঁজা শুরু করে। তারা ২/১ দিনের মধ্যেই থাবা বাবা’র বন্ধুদেরকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ব্লগার রাজীবকে চিনতে পারে। রাজীবকে চেনার পর ইনটেল গ্রুপের সদস্য এহসান রেজা রুম্মান শাহবাগ থেকে সাইকেলযোগে বাসে উঠা রাজীবকে অনুসরণ করেন মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত যায়। প্রথম দিন রাজীবের বাসা চিহ্নিত করতে পারেননি। পুনরায় তাকে একইভাবে অনুসরণ করে রাজীবের পল্লবীস্থ পলাশনগরের বাসা চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। রাজীবের বাসা চিহ্নিত করার পরে কয়েকদিন ধরে ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে রেকি করা শুরু করে এবং বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। তারা রাজীব কখন বাসায় আসে, কখন বের হয়, কার সাথে ঘোরাফেরা করে এবং কি ধরনের কাজ করে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। ইনটেল গ্রুপের সদস্য মাকসুদুল হাসান অনিক হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অস্ত্র কেনা ও অন্যান্য খরচ প্রদান করেন। পরে অনিক নিজেই বাড্ডা নতুন বাজারের একটি দোকান থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে চাপাতি ও ছোরা কেনেন। তথ্য সংগ্রহ ও যাবতীয় প্রস্তুতি শেষে ঘটনার দিন সবাই মিলে সাইকেলে ও বাসে চড়ে বিকাল চারটার দিকে পল্লবীর পলাশনগরস্থ রাজীবদের বাসার গলিতে অবস্থান নেন এবং স্কুল ব্যাগ, ক্রিকেটের ব্যাট ও বল ইত্যাদি তাদের সাথে থাকে। আসামিরা সবাই মিলে গলিতে ক্রিকেটও খেলেন এবং রাজীবের বাসায় ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। সন্ধ্যার দিকে রাজিব যখন তার বান্ধবী তানজিলাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে পল্লবীস্থ বাইশটেকি হয়ে তার বাসার দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে অনুসরণ করে। বাসার গেইটের কাছাকাছি পৌঁছার পর এক্সিকিউশন গ্রুপের সদস্যদের ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ তাকে চাপাতি দিয়ে রাজিবের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করার উদ্দেশ্যে ঘাড়ে কোপ দেন এবং কোপে আহত হয়ে রাজিব চিত্কার করে দেয়ালে পড়ে যান। তারপর ফয়সাল রাজিবকে চাপাতি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে এবং আসামি অনিকও তার হাতে থাকা ছোরা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে দৌড়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত একটি চাপাতি রাস্তার মোড়ের পানের দোকানের সামনে ফেলে যান।
চাপাতি উদ্ধার : ডিবি এডিসি মশিউর রহমান জানান, রাজিবকে হত্যা করার সময় আসামি নাঈম এর এলোপাথাড়ি কোপের একটি অনিকের জুতায় লেগে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের কিছু অংশ কেটে যায় এবং অনিক রুম্মানের সাথে কাকরাইল এসে জুতাজোড়া খুলে জাতীয় চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের পুকুর পাড়ে ফেলে যান। অনিক গ্রেফতার হবার পর তার সহায়তায় জুতাজোড়া উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাবার সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত আরও একটি চাপাতি ও চারটি ছোরা শেরে বাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার পার্শ্বের ড্রেনের মধ্যে ফেলে যায়। তাদের সহায়তায় সেগুলো উদ্ধার করে মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে আসামিরা একটি সাইকেল ও দু’টি স্কুল ব্যাগ ব্যবহার করেছে, যা তাদের দেখানোমতে উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়।
যেভাবে গ্রেফতার হয় : রাজীব নিহত হবার পর গোয়েন্দা পুলিশ ঘটস্থলসহ আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহত রাজীবের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে তেমন কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। তবে গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুনীদের গ্রেফতারে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ ও গ্রেফতারকৃতদের বেশ কয়েকজন সহযোগী। এরপরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মোল্লা নজরুল ইসলামের তত্ত্ব্বাবধানে এডিসি মশিউর রহমান, এডিসি মানস কুমার পোদ্দার ও সিনিয়ার এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে একাধিক টিম ঢাকা মহানগরীর কাকরাইল, বারিধারা বসুন্ধরা, পান্থপথ এবং খিলগাঁও এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও দু’জনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গ্রেফতারকৃতদের পরিচয় : ফয়সাল বিন নাঈমের বাড়ী মাতুয়াইল, ঢাকা এবং অনিকের বাড়ী-কেরানীগঞ্জ। তারা দু’জনই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেট্টিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। নাঈম কোডা কলেজ, ঢাকা থেকে এইচএসসি পাস করে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অপরদিকে অনিক ম্যাপল লিফ থেকে ও-এ লেভেল পাস করে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। রুম্মান এর বাড়ী ঝিনাইদহ জেলায় ও ইরাদ এর বাড়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং তারা দু’জনই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। গ্রেফতারকৃত অন্য আসামি নাফিস ইমতিয়াজ সান সাইন গ্রামার স্কুল থেকে ও লেভেল এবং এ লেভেল পাস করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’তে ভর্তি হন এবং বর্তমানে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ী সন্দ্বীপে।
রিমান্ড: মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতারৃত পাঁজজনকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায়। ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ শুনানি শেষে সাত দিনের রিমান্ড দেন। রিমান্ড বাতিল কিংবা জামিনের জন্য আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
গ্রেফতারকৃতদের ছাত্রত্ব স্থগিত : গ্রেফতার পাঁচ শিক্ষার্থীকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রত্ব স্থগিত করেছে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বেলাল আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের পরিচয় পত্র/ছাত্রত্ব স্থগিত করেছে। আজ রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় খুললে এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
