খ্যাতিমান স্থপতির কথা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:০৮
তানজানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই স্থপতি শুরুতেই স্থাপত্যবিদ্যায় এত আগ্রহী ছিলেন না। পড়াশোনাটাও তাই সেই কেন্দ্রিক আবর্তিত হয়নি। ১৯৯৩ সালে আর্ট এ মাস্টার্স ডিগ্রি নেন তিনি। আর ঠিক এই সময়েই তিনি পেয়ে যান আরআইবি-এর ব্রোঞ্জ মেডেল। সেটাও প্রথম ধাপের শিক্ষার্থীদের জন্য একটা প্রজেক্টের পুরস্কারস্বরূপ তিনি এই সম্মাননা পান। অতীতে এত অল্প বয়সেই আরআইবি-এর মতো সম্মানজনক পুরস্কার খুব কম মানুষই পেয়েছেন। তখন থেকেই তিনি কাজ করেছেন লন্ডনের সেই সময়কার খ্যাতিমান স্থপতিদের সাথে, ডেভিড চিপার ফিল্ডের সাথে কাজ করার পর ২০০০ সালে নিজেই স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে এসেছিলেন এই বিশ্বজয়ী স্থপতি। নাম তার ডেভিড আজায়ে, সম্প্রতি ঢাকায় হয়ে যাওয়া কমনওয়েলথ দেশগুলোর স্থপতিদের সম্মেলনে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। সম্মেলন চলাকালীন রাজধানীর একটি হোটেলে ডেভিড আজায়ে ইত্তেফাককে শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র দেশে-বিদেশে সাড়াজাগানো প্রজেক্টের এই স্থপতি খুব সাদামাটা জীবন যাপন করেন, নিজের সব প্রজেক্টের মতোই! বলেই খানিকটা হাসলেন তিনি। সব সময়ই তার চাওয়া থাকে কী করে সাধারণ জিনিসটা অসাধারণ করে উপস্থাপন করা যায়। ডেভিড আজায়ের দর্শনও তেমন। তার মতে নতুন কিছু করার চেয়ে নতুন করে ভাবতেই ভালো লাগে তার। কথার শুরুতেই বাংলাদেশে স্বাগতম জানানোর পর তিনি বললেন, দেশটা তার খুবই ভালো লেগেছে, আবহাওয়া আর জলবায়ুও দারুণ মনে হয়েছে। বাংলাদেশের স্থাপত্যের কথা জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে। ডেভিড তখনও বাংলাদেশ সম্পর্কে এতটা জানেননি। তবুও তিনি অবাক হয়েছেন এত অল্প জায়গাতে এত এত মানুষ যে বাস করছে, খুব তো সমস্যা হচ্ছে না! আর যানজটের মতো সমস্যা বিশ্বের আরও অনেক দেশে আছে, একটু পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার এই যা, আমার ধারণা বাংলাদেশও সেই মাফিক এগোচ্ছে। তা না হলে এই বাস্তবতাতেও দেশটা আর চলত না, স্থবির হয়ে যেত। ভিনদেশিদের কাছেও যেন আমরা আমাদের সমস্যা দেখাতে কম যাই না, প্রসঙ্গ থেকে দূরে এসে তাই আমাদের কোন জিনিসগুলো তার ভালো লাগে জানতে চেয়েছিলাম। প্রথমেই তিনি মোগল স্থাপত্যের উল্লেখ করে বলেন, অনেক অনেক বছর আগেও যেই দেশে উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াও বিশাল বিশাল এই দালানকোঠা গড়ে উঠেছে, সেখানের মানুষ অনেকটাই সৌভাগ্যবান। বিশেষত মোগলদের স্থাপত্যের আলাদা শৈলী ছিল, গঠনরীতি ছিল, বিশ্ব স্থাপত্যেও তা অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশেও অনেক পুরোনো স্থাপত্য দেখেই বুঝা যায়, কতটা নিপুণ ছিল সেই সময়ের কাজের ধারা। যদিও তার সব দেখার সুযোগ হয়নি। অনলাইনে সব সময়ই তিনি বিশ্বের সব জায়গারই প্রকল্পগুলো দেখেন, ইতিহাস বুঝার চেষ্টা করেন। আর্টের শিক্ষার্থী ছিলেন ডেভিড, আগ্রহ তাই খুব বেশি তার। ডেভিড আজায়ে বলেন, ‘প্রতিটি দেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলো একটি জাতির টিকে থাকার অন্যতম উপকরণ। পাশাপাশি ঋতুবৈচিত্র্য, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য মানুষের জীবন-জীবিকায় নানাভাবে প্রভাব ফেলে। এজন্য যেকোনো স্থাপনা গড়ে তোলার আগে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, যেকোনো স্থাপনার কাঠামোগত দিকের সঙ্গে এর নান্দনিক দিকও রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বর্তমানে সারা বিশ্বের উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় স্থপতিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণের কথা চিন্তা করে সব কাজ করতে হয়। ডেভিড মনে করেন, স্থাপত্য অনুশীলন মূলত একইসঙ্গে একটি শিল্প এবং একটি পেশাদার কাজ। আবার এর একটি ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক দিকও আছে। এখানেই সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্বের। সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন স্থাপত্যের শৈল্পিক মানকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পায় কেবলই অর্থনৈতিক স্বার্থ। একজন স্থপতির কাজ হচ্ছে সামাজিক চাহিদা, অর্থনৈতিক দিক, কৃষ্টি-ঐতিহ্য এসব ব্যাপারে সচেতন থেকে শৈল্পিক মানসম্পন্ন স্থাপত্য রচনা করা। একইভাবে স্থাপত্য কাজ শেখার ব্যাপারে আগ্রহের ওপরেও প্রাধান্য পাচ্ছে আর্থিক দিক। যেমন—আমাদের অফিসে শিক্ষার্থী নবীনদের যে সম্মানী দেওয়া সম্ভব, বাইরে তারা এরচেয়ে দেড় গুণ অথবা দুই গুণ বেশি সম্মানী পেতে পারেন। ফলে তারা আমাদের কাছে কাজ শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এভাবে প্রবীণদের কাছে কাজ পাওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন না থাকায় কোনো কর্ম-অভিজ্ঞতা ছাড়াই নবীন স্থপতিরা অফিস খুলে বসেছেন। যার ফলে সৃষ্ট স্থাপত্যের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এর মানে কিন্তু এ নয় যে, কোনো নবীন স্থপতি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারবেন না। দু-একজন প্রতিভাবান নবীন স্থপতি প্রথম থেকেই অতি সুন্দর কাজ করতে পারেন। এটা নিয়মের ব্যতিক্রম। এই কথা মনে রেখেই সকল নবীন স্থপতির জন্য আরও দু-এক বছর প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্যই অ্যাপ্রেনটিসশিপ। ডেভিডের সম্প্রতি করা কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেনভারে মিউজিয়াম অব কনটেমপোরারি আর্ট, অসলোতে নোবেল পিস সেন্টার, রাশিয়াতে স্কলকোভো মস্কো স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট, ২০০৯ সালে এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনে আফ্রিকান আমেরিকান ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর জাদুঘরের কাজ হাতে পান। প্রায় পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি ২০১৫ সাল নাগাদ শেষ হওয়ার কথা। অসাধারণ এই স্থাপত্যটি হবে তার সেরা কাজ, মনে করছেন অনেকেই। কথার এক পর্যায়ে ডেভিড আমাদের আমন্ত্রণও জানালেন তার এই প্রকল্প দেখতে। মজার বিষয় হচ্ছে ডেভিড নিজেও অনেক ডিজাইনারের বাসভবন ডিজাইন করে দিয়েছেন, শিল্পী ও কলাকুশলী অনেকেরই বাসার ডিজাইন তার হাতে করা। স্পেনে তিনি একটি বিচ-হাউজ করে সাড়া ফেলেছেন। শেখর কাপুরের স্তাহে সংকল্প নামে একটি আর্ট প্রজেক্টেও কাজ করেছেন তিনি। বিবিসির জনপ্রিয় প্রোগ্রাম ড্রিম স্পেস ও বিবিসি রেডিওর স্থাপত্য বিষয়ক প্রোগ্রামের সাথে কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে ডেভিড আজায়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার স্কুলের অধ্যাপনার পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব পেনিসিল্ভানিয়া, হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ডিজাইনের সাথে যুক্ত ছিলেন, ডেভিড আজায়ে ব্রিটেনের স্থপতি সংগঠন আরআইবি-এর একজন চার্টার্ড মেম্বার। আমেরিকান স্থপতি সংস্থা এআইএর একজন ফেলো তিনি। আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটারসের সদস্য ডেভিড আজায়ে। বহুগুণের এই স্থপতি আবার বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচারেরও উপদেষ্টা ডেভিডের প্রথম বই ডেভিড আজায়ে হাউজে, এরপর ২০০৬ সালে এর হয় তার দ্বিতীয় বই ‘ডেভিড আজায়ে :মেকিং পাবলিক বিল্ডিংস’। ডেভিড আজায়ে শোনাচ্ছিলেন তার এগিয়ে যাওয়ার গল্প। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সেই ব্রিটেনের একটি পত্রিকা তার সম্পর্কে লিখেছিলেন সময়ের সবচেয়ে ফ্যাশনেবল আর্কিটেকচারের আর্কিটেক্ট আজায়ে। একজন আফ্রিকান আর কালো বর্ণের হওয়া সত্ত্বেও অনন্য এক অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠান সব ধরনের কাজই করে থাকে, যেমন আবাসিক অথবা বাণিজ্যিক। আর ম্যাটেরিয়ালের ক্ষেত্রেও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা তাদের। কাঠ আর কনক্রিটের দারুণ সমন্বয় রয়েছে ডেভিডের কাজে। একজন আর্কিটেকচার বিষয়ক লেখক রোয়ান মুরে মন্তব্য করেছিলেন, সাদা চামড়ার মানুষেরাই এই কাজ করে আসছে এতদিন, অথচ কালো বর্ণের হয়েও ডেভিড যা করে দেখাল, আমার মনে হয় এটাও তার অনেক বড় অর্জন। ডেভিড প্রথম সুনাম কুড়ান ইলেক্ট্রা হাউজ নামের এক প্রজেক্টে পূর্ব লন্ডনের এক প্রকল্পে। ডেভিড আজায়ে জন্ম :তানজানিয়ায় ১৯৬৬ সালে, একজন ডেমোক্রেটিকের ঘরে শিক্ষা :সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটি থেকে বিএ, এরপর রয়াল কলেজ অব আর্ট থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবন :১৯৮৮-১৯৯০, স্থপতি হিসেবে চ্যাসি আর্কিটেক্টসে, তারপর ডেভিড চিপারফিল্ডে তারপর উইলিয়াম রাসেলের সাথে ছয় বছর কাজ করেন। ২০০০ সাল থেকে শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান আজায়ে অ্যাসোসিয়েটস। পুরস্কার ব্রিটেনের রানি ব্রিটিশ স্থাপত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ডেভিড আজায়েকে ২০০৭ সালে ‘অবে’ সম্মাননা প্রদান করেন। ২০০৬ সালে এই স্থপতি একটি প্রকল্পের জন্য স্টিরলিং প্রাইজের জন্য মনোনয়নের তালিকায় চলে আসেন। এ ছাড়াও পেয়েছেন— ++ আরআইবিএ ব্রোঞ্জ মেডেল (১৯৯৩) ++ ডিজাইনারস ফিউচার কাউন্সিল সিনিয়র ফেলো ++ ডিজাইনার অব দ্য ইয়ার (২০১১) ++ ব্রিটেনের সেরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত হন (২০১২)।