সফলজনের গল্প

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:০৯
মেধা, পরিশ্রম এবং সততার সমন্বয়েই নিজেকে আজ অধিষ্ঠিত করেছেন সফলতার শিখরে, নিজের ক্যারিয়ারকে সাজিয়েছেন নানা মেধাবী রঙের ছোঁয়ায়। পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও একাধারে নিজের সুপ্ত প্রতিভাগুলোকে কোনোভাবেই লুকিয়ে রাখেননি, লেখার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন নিজের ভালো লাগার একটি ভিন্ন জগত্। বলছিলাম গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিএমএম কামাল পাশা সম্পর্কে। প্রজন্মের এই সফলজনকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার পাবনা জেলার বড়াল নদী অববাহিকায় সেলন্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিএমএম কামাল পাশা। স্রোতস্বিনী বড়ালের বুকে সাঁতার কেটে, খালে-বিলে-জলাশয়ে মাছ ধরে, খোলা মাঠে ফুটবল-হাডুডু খেলে, গাছের ডালে চড়ে পাকা ফল খেয়ে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা তার। বাবা ছিলেন শিক্ষক। মুক্ত বুদ্ধির চর্চা ছিল পরিবারে। বাবার আদর্শই ছিল তার সারাজীবনের অনুপ্রেরণা। পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনের সব সময়ের সঙ্গী পেশায় একজন আইনজীবী। চার মেয়ের জনক কামাল পাশার বড় দুটি মেয়ে যমজ। দুজনই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছেন। তৃতীয় মেয়ে তনুমা, এ-লেভেল পরীক্ষা দিয়েছেন এ বছর। ছোট মেয়ে তনিশা পড়ছে মাস্টার মাইন্ড স্কুলে কেজিতে। জিএমএম কামাল পাশার শুরুটা একটু অন্যরকম। নটরডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করার পর বাংলায় অনার্স পড়ার ইচ্ছা ছিল। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলেন খুব ভালোভাবেই। ভর্তি হয়ে গেলেন ওখানে। পড়া হলো না প্রিয় বিষয় বাংলা। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেন ১৯৮৩ সালে। গ্রামগঞ্জ ঘুরে ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুলঘর বানাতে থাকলেন। দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছাকাছি কাজের সুযোগ তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ বোধ করলেন ভিতরে। তারপর থেকেই সহজ ও সাবলীল বাংলা ভাষায় নির্মাণ প্রযুক্তি নিয়ে বই লেখার চিন্তাভাবনা শুরু করেন তিনি। সফলতার পাশাপাশি পেশা হিসেবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে জিএমএম কামাল পাশা বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী হিসেবে দেশের উন্নয়নে ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। এটি একটি সৃষ্টিশীল পেশা। এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরে আমি আনন্দিত।’ আর নিজের লেখা বইগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম বইয়ের নাম ‘ইমারত ও পরিবেশ’। পরিবেশের বিষয় বিবেচনায় রেখে ইমারত তৈরির কলাকৌশল নিয়ে এটি লেখা। বইটি ঐতিহ্য প্রকাশনী কর্তৃক ২০০১ সালে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত। একজন লেখকের জন্য প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতিই আলাদা, যা সত্যি আনন্দের ও গর্বের। এরপর পেশাগত কর্মব্যস্ততার জন্য লেখা হয়ে ওঠেনি বহুদিন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বাবার মৃত্যুর পর বদলী হয়ে যাই মৌলভীবাজার জেলায়। দূরবর্তী জেলায় একা থাকতে থাকতে নিজের জীবন, বেড়ে ওঠা, সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে ‘কালের উজানে’ নামে স্মৃতিকথামূলক বই লিখি। মৌলভীবাজার থেকে পদোন্নতি পেয়ে যশোরে চলে আসি।’ মহাকবি মাইকেল মধূসূদন দত্তের জেলা যশোরে বসে আমি পরপর তিনটি বই লিখি। একটি গল্পগ্রন্থ, যার নামকরণে মেয়ে তনুমার নাম ব্যবহার করেছি। পরের দুটি বই ‘নির্মাণ করি সুন্দর বাড়ি’ ও ‘ভূমিকম্প সহনীয় ও পরিবেশ বান্ধব দালান নির্মাণ’ ২০১৩ সালে একুশে বই মেলায় প্রকাশিত। প্রথমটি ব্যয় সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও পরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণে দেশের মানুষকে সচেতন করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দ্বিতীয়টি ভূমিকম্পের মতো অনিশ্চিত দুর্যোগ মোকাবেলায় ভূমিকম্প সহনীয় দালান নির্মাণের কলাকৌশল নিয়ে লেখা। এ ছাড়া সৌর বিদ্যুত্, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার, শব্দ দূষণ ইত্যাদি বিষয়ে এই বইতে সহজভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এটি সময়োপযোগী ও সকলের জন্য প্রয়োজনীয় একটি বই। বর্তমানে একটি উপন্যাস লেখার কাজ এগিয়ে চলছে।’ এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ও পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশে আগের চেয়ে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার। নতুন প্রজন্ম শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার প্রযুক্তির ছোঁয়া নিয়ে বেড়ে উঠছে। চিন্তা চেতনায় তারা প্রযুক্তি মনষ্ক, অনেক সম্ভাবনাময়। এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশেকে উন্নতির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। সাফল্য অর্জনের পথ কোমল নয়, কঠিন ও দীর্ঘ। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাই জ্ঞানের নিবিড় চর্চায়।’ তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন একটাই। আরও ভালো কিছু লিখতে চান তিনি, লেখার মাধ্যমে মানুষের হূদয় ছুঁয়ে যেতে চান জিএমএম কামাল পাশা। জিএমএম কামাল পাশা ডাক নাম :কামাল পাশা জন্মতারিখ ও স্থান :০১ এপ্রিল ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ, সেলন্দা, পাবনা। মায়ের নাম :আলহাজ্ব খোদেজা বেগম বাবার নাম :মরহুম আলহাজ্ব আমিন উদ্দীন প্রথম স্কুল :সেলন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :মা প্রিয় উক্তি :কৃতজ্ঞতার মাঝে বিস্ময় যায় হারিয়ে। প্রিয় পোশাক :স্যুট-টাই। অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে ও লেখালেখি করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাধনা ও শ্রম দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠা।