দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে জামায়াত-শিবির। জনগণ তাদের প্রত্যাখান করেছে। তাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। ধর্ম নিয়ে তারা প্রতারণা করছে। বৌদ্ধ-হিন্দুদের উপর হামলা করে সাম্প্রদায়িক হানাহানি সৃষ্টির পায়তারা করেছে। তাদের প্রতিহত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে তারুণ্যের যুদ্ধকে আরো বেগবান করতে সর্বস্তরের জনগণ এগিয়ে এসেছে। এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। আর যে সাম্প্রদায়িক শক্তি দাঙ্গা-সহিংসতা সৃষ্টি করছে, পাড়ায়-মহল্লায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার দুর্গ গড়ে তাদের প্রতিহত করতে হবে। তারুণ্যের এ লড়াইয়ের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তাই দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
গতকাল রবিবার বিকালে রাজধানীর পুরান ঢাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক সংলগ্ন সড়কে গণজাগরণ মঞ্চে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলনরত জনতা এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গণজাগরণ মঞ্চ রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর ১০ নম্বর গোল চক্কর ও মতিঝিলের শাপলা চত্বরের পর শাহবাগের বাইরে গতকাল বিকালে বাহাদুর শাহ পার্কে এ সমাবেশের আয়োজন করে। আন্দোলনের ২৭তম দিনেও ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন তরুণ-ছাত্র-যুবারা। সমাবেশে হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে তরুণদের দাবির প্রতি সংহতি জানান। সর্বস্তরের মানুষ স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন বাহাদুর শাহ পার্ক ও সংলগ্ন এলাকা। এর আগে দুপুরে জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে রাজধানীতে হরতাল বিরোধী মিছিল করে গণজাগরণ মঞ্চ। হরতাল প্রতিহত করতে জনগনকে আহবান জানান আন্দোলনরতরা।
সমাবেশ থেকে আগামী ৮ মার্চ নারী দিবসে বিকাল ৩টায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে নারী জাগরণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একইসাথে ৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীতে এবং ৭ই মার্চ সোহওয়ার্দী উদ্যানে পূর্বঘোষিত সমাবেশ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে বলে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আজ সোমবার জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে রাজধানীতে মিছিল বের করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন মঞ্চের সংগঠকরা।
মঞ্চের সংগঠকরা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মঞ্চের সাথে সংহতি প্রকাশের আহবান এবং জামায়াতের প্রচার সম্পাদক তাসনিম আলমের সদস্যপদ প্রেস ক্লাব থেকে বাতিল করারও আহবান জানান।
বাহাদুর শাহ পার্কের সমাবেশে সভাপতির বক্তৃতায় জনগণের উদ্দেশে গণজাগরণ মঞ্চের আহবায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, জামায়াত-শিবির চক্র দেশে দাঙ্গা-খুন শুরু করেছে। এদেরকে জনগণ বর্জন করেছে। এখন প্রতিহত করতে হবে। যারা বৌদ্ধ মন্দির পোড়াচ্ছে, হিন্দুদের ঘর-বাড়ি পোড়াচ্ছে, মন্দির পোড়াচ্ছে- তাদের চিহ্নিত করুন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছিল, মানুষ হত্যা করেছিল, তাদের বিচার হচ্ছে; ২০১৩ সালের এ মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করছে তাদেরও পরে বিচার করা হবে। এদের লিস্ট (তালিকা) করে রাখুন।
ইমরান এইচ সরকার বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন, কে শক্তিশালী শাহবাগ না সরকার? আমরা বলব, শাহবাগ শক্তিশালী। কেননা শাহবাগই আপনাদের ভোট দিয়ে সরকার বানায়। ১৬ কোটি মানুষই শাহবাগ। ভোট দিয়ে তারা আপনাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, কেউ কেউ বলেন- আমাদের আন্দোলনে কোনো কোনো মহলের মদদ রয়েছে। অবশ্যই মদদ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মদদ রয়েছে। সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি এবং জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। জনগন আমাদের সাথে রয়েছে।
ইমরান বলেন, একাত্তরের রাজাকাররাই এখন রাজপথে সহিংসতা শুরু করেছে। রগকাটা শুরু করেছে। রাজপথ রক্তাক্ত করে পুলিশ হত্যা করেছে। এ হত্যা-রগকাটার রাজনীতি নিষিদ্ধ করতেই হবে।
ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, গণজাগরণ মঞ্চ অনেকের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। শাহবাগের মঞ্চ থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ধরনের মিথ্যাচার বন্ধ করুন। শাহবাগের আন্দোলন অহিংস। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ না হওয়া আমাদের আন্দোলন চলবে।
তিনি বলেন, বড় কঠিন সময় পার করছে স্বদেশ। পুলিশের উপর হামলা করে কেউ আত্মাহুতি দিলে তাকে আমরা গণহত্যা বলতে পারি না। এটি গণহত্যা হলে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে কী বলব?
সোহাগ বলেন, চাঁদে নাকি সাঈদীকে দেখা গেছে, এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির। অনেক মসজিদে সেই ঘোষণাও দেয়া হয়। এরা কতবড় ভন্ড-প্রতারক। এরা দেশদ্রোহী। এদের পাড়ায়-মহল্লায় সামাজিকভাবে বিচার করুন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক চেতনার দুর্গ গড়ে তুলুন।
জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি কোথায় গৃহযুদ্ধ দেখছেন। বাংলাদেশ আমাদের গৃহ। আমাদের পূর্বপুরুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন করেছে। আমরা গৃহে যুদ্ধ চাই না। আপনার গৃহ পাকিস্তান। পাকিস্তানে চলে যান। সাম্প্রতিক সহিংসতায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে তিনি দু:খ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। একাত্তরের মতোই এই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে আমরা আপনাদের সমর্থন প্রত্যাশা করি।
তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরের মৃত্যুতে যারা গণহত্যা দেখছেন তারা রাজাকার। ১৯৭১-এ জামায়াত গণহত্যা করেছে। তাদের সমর্থনকারীরা নব্য রাজাকার। কাদের সিদ্দিকী এখন আর বঙ্গবীর নয়, তিনি নব্য রাজাকার।
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এসএম শুভ বলেন, খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। রাজাকারদের রক্ষায় যদি তাদের আন্দোলন হয়ে থাকে তবে তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, সহিংসতা যদি গণহত্যা হয়, তবে ১৯৭১ সালে কী হয়েছিল? গণজাগরণ মঞ্চ কারো তাবেদারি করে না। এ মঞ্চের কোনো নেতা নেই, কমিটি নেই। আপনি হুশ থাকতে মঞ্চে এসে সংহতি জানান। অবশ্য আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, জামায়াতের কাছে ঋণী রয়েছেন। তাই তাদের ছাড়তে পারবেন না।
জনগণ আর ঘরে বসে অশ্রু ফেলবে না, বাঁশের লাঠি নিয়ে রাজপথে জামায়াত-শিবির প্রতিহত করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মেসবাহ উদ্দিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আশরাফুল আলম, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট নজিবুল্লাহ হিমু, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি প্রবীর সাহা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি আবদুর রউফ, ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল, ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মঞ্জুরুর রহমান মিঠু, ছাত্র ঐক্য ফোরামের আহ্বায়ক সোহান সোবহান।
বিকাল ৩টা ৫৪ মিনিটে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশের শুরুতে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। সমাবেশে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেন। সমাবেশ শেষে আন্দোলনের সংগঠকরা শাহবাগে ফিরে আসেন। শাহবাগে রাত পর্যন্ত আন্দোলনরতরা অবস্থান করেন।
কাল যাত্রাবাড়িতে, ৮ মার্চ শাহবাগে সমাবেশ
নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামী ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে নারী জাগরণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। গতকালের সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার। এছাড়া পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আগামীকাল যাত্রাবাড়ির চৌরাস্তায় সমাবেশ এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তনে শ্রদ্ধা নিবেদন সমাবেশ ও প্রতিবাদী গান অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি পুনরায় ঘোষণা দেন। একইসাথে জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে আজ সকাল ১০টায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে হরতাল বিরোধী মিছিল বের হবে বলে তিনি জানান।
হরতালবিরোধী মিছিল
এদিকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে গতকাল ১১টার দিকে হরতালবিরোধী একটি মিছিল বের করে গণজাগরণ মঞ্চ। মিছিলটি শাহবাগ থেকে কাঁটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী মোড় হয়ে বুয়েট ক্যাম্পাস, চানখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর ও টিএসসি হয়ে আবারও শাহবাগে এসে শেষ হয়। সমাবেশে তরুণ কণ্ঠে স্লোগান উঠে- ‘জয় বাংলা’; ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠো আরেকবার’; ‘জামায়াতে ইসলাম, মেড ইন পাকিস্তান’; ‘জামায়াত ধর, জবাই কর, শিবির ধর, জবাই কর’; ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, জামায়াত-শিবির খতম করো’; ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’; ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি’; ‘অবৈধ হরতাল, মানি না, মানবো না’।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়ায় প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশের তরুণরা। ঐ দিন বিকালে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নেন ব্লগার এন্ড অনলাইন একটিভিস্ট নেটওয়ার্কের সদস্যরা। তাদের সাথে যোগ দেন সর্বস্তরের জনগণ। সেই অবস্থান গণজাগরণ মঞ্চ নাম ধারণ করে ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল ২৭তম দিন পার করেছে। ছয় দফার পক্ষে শাহবাগসহ দেশের বিভিন্নস্থানে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চলছে।
শাহবাগে স্থায়ী মঞ্চ
শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে গতকাল একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘর সংলগ্ন সড়কে এ মঞ্চ তৈরি করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা।
মঞ্চের একাধিক সংগঠক জানিয়েছেন, সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে এ মঞ্চেই প্রতিদিন নিয়মিত সমাবেশ-শ্লোগান চলবে। তবে মহাসমাবেশ ও বিশেষ কর্মসূচী মঞ্চের বাইরে গিয়েও অনুষ্ঠিত হতে পারে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকবে, এমন পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই এ মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
