চৌদ্দ বছরেও পাওয়া গেল না উদীচী হত্যাকাণ্ডের বিচার

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২২:১৬
আজ শোকাবহ উদীচী ট্রাজেডির ১৪তম বার্ষিকী। আজকের দিনটিকে সংস্কৃতি রক্ষা দিবস হিসেবে উদীচী পালন করবে। আজও চাঞ্চল্যকর এই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের নায়কদের মুখোশ উন্মোচন সম্ভব হয়নি। পাওয়া গেল না বিচার। মামলাটির পুনঃতদন্ত কার্যক্রম শুরু হলেও এই অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট নয় যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ। দীর্ঘ একযুগ পেরিয়ে গেলেও পৈশাচিক এই ট্রাজেডির শিকার নিহত কিংবা আহত পরিবারের সদস্যরা ভালো নেই। অনেকেই পঙ্গুত্ব নিয়ে বর্তমানে অসহনীয় জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তারপরও এই হামলার সঙ্গে জড়িত ঘাতকদের বিচারের দাবিতে তারা আশায় বুক বেধে আছেন। জীবদ্দশায় সবাই ঘাতকের বিচার দেখতে চান। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ রাতে যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভয়াবহ দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ১০ জন নিহত ও শতাধিক নারী পুরুষ আহত হন। উদীচী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর এ ব্যাপারে পৃথক দুটি মামলা হয়। প্রথমে কোতয়ালি পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করলেও পরবর্তীতে তা সিআইডির উপর ন্যস্ত হয়। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। পরবর্তীতে চার্জ গঠনের সময় উচ্চ আদালতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তরিকুল ইসলামকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এ মামলা আদালতে গড়ানোর ৭ বছর পর ২০০৬ সালের ৩০ মে মামলার রায় প্রদান করেন আদালত। রায়ে সব আসামিকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার এমন রায় শুনে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা উদীচী হত্যা মামলা পুনঃতদন্ত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ২০০৭ সালে দেশের আলোচিত জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান আটক হওয়ার পর পুলিশের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথা স্বীকার করে। এই জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে উদীচী হত্যা মামলা পুনঃতদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উদীচী হত্যা মামলার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়। ২০১০ সালের ৮ জুন এই আপিল আবেদনের শুনানি হয়। বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এই শুনানির পর হাইকোর্ট থেকে জারিকৃত এ সংক্রান্ত নথিপত্র ২০১০ সালের ২৬ জুলাই যশোর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৌঁছায়। খালাসপ্রাপ্ত ৬ আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ না করায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তবে ওই ৬ জনের মধ্যে শংকরপুরের আলোচিত সিন্ডিকেট প্রধান হাসান ও তার ভাই মিজান ক্রসফায়ারে এবং শহরের ঘোপ এলাকার মহিউদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বাকি দুইজন শংকরপুরের সোহরাব ও ভাতুড়িয়া এলাকার মেহেদি হাসান লিটু পলাতক রয়েছে। আর শরিফুল ইসলাম মিন্টো পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। খালাসপ্রাপ্ত বাকি ১৭ আসামি ইতিমধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। এরপর ওই মামলার আর কোন অগ্রগতি হয়নি। বোমা বিস্ফোরণে আহত শহরের নীলগঞ্জ তাঁতীপাড়ার সাংস্কৃতিক কর্মী সুকান্ত দাসের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শিখে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির। কিন্তু পঙ্গুত্ব তার জীবনকে বিবর্ণ করে দিয়েছে। যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের হরেন্দ্র নাথ অধিকারীও উদীচী ট্রাজেডির শিকার হয়ে দু’পা হারিয়ে চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে গেছেন। দু’পা হারিয়েছেন যশোরের জোড়াকুটি রোডের মোহাম্মদ নাহিদ। বোমায় নিহত নূর ইসলামের স্ত্রী নূরজাহান আজও আশায় বুক বেধে আছেন স্বামী হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার। হতাহত পরিবারের সদস্য সামসুন্নাহার, নিখিল রায়, হরেন্দ্র নাথ অধিকারী, মোহাম্মদ নাহিদ, সমীর কুমার সরকার, সেকেন্দার আলী, মনোয়ার হোসেন মনু, লিয়াকত আলী ও হারুন অর রশিদের মতো অনেকেই উদীচী ট্রাজেডির দুঃসহ যন্ত্রণার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেদিনের সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী উদীচী যশোর সংসদের সাধারণ সম্পাদক ডি এম শাহীদুজ্জামান বলেন, আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা আর আশ্বাস নয়, অবিলম্বে হামলাকারীদের বিচার চাই। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যশোর জেলা শাখা আজ বিকেলে উদীচী চত্বরে আলোচনা সভা, প্রতিবাদী গান ও আলোক প্রজ্বলনের মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।