খুলনায় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষ ৪ বছর বেড়িবাঁধে

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২২:১৭
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আইলার তান্ডবে উপকূলীয় অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হওয়ার পর ৪ বছর কেটে গেলেও খুলনার উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার দু’টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিন হাজার অসহায় মানুষ অর্থাভাবে ঘরে ফিরতে পারছে না। এলাকায় কাজ না থাকায় জীবন জীবিকার সন্ধানে অনেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে চলে গেছে। ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার জলোচ্ছ্বাসে বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চল দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়। বিশেষ করে ৩২নং পোল্ডারে আইলার প্রবল জলোচ্ছ্বাসে সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত নলিয়ান নদীর দুই পাশের ছোট-বড় ৭/৮টি গ্রামের অধিকাংশ ঘর-বাড়ি ,গাছপালা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। একই সঙ্গে খরোস্রোতা নলিয়ান নদীর গোড়ায় শিবসা’র মুখে ৯ ব্যান্ডের স্লুুইসগেট এবং উড়ামুখো ও গোলবুনিয়া, দর্শনখালীর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল প্ল¬াবিত হয়। তখন কামারখোলা ইউনিয়নের পশ্চিম শ্রীনগর গ্রাম থেকে শুরু করে নলিয়ান বাজার ও অপর পাড়ে গুনারী এলাকার মোট ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পাশে শ্রীনগর, পশ্চিম সুতারখালী, বাইনপাড়া, গাইনপাড়া, গাজীপাড়া, নলিয়ান ও গুনারী গ্রামগুলো জোয়ারের পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। আবার ভাটায় জেগে ওঠে। এ কারণে এসব এলাকা ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পড়ায় ও গাছপালা মরে যাওয়ায় বিরানভূমিতে পরিণত হয়। বাধ্য হয়ে সেখানকার মানুষ পার্শবর্তী পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ওপর খুপরি ঘর বেঁধে বসবাস শুরু করে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উড়ামুখো ও দর্শনখালীর ভেঙ্গে যাওয়া স্থান দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ড বেঁধে ফেলে। কিন্তু শিবসা নদী সংলগ্ন নলিয়ান নদীর গোড়ায় বাঁধ না দেয়ায় প্রতিনিয়ত নদীর জোয়ারের পানিতে গ্রামগুলো তলিয়ে যায়। আর সে কারণে প্রায় ৬ শতাধিক পরিবারের প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রায় ৪ বছর ধরে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। ঝড়ের পর থেকে নলিয়ান নদীর পাশে বেড়িবাঁধে বসবাসরত কামারখোলা ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামের প্রভাতি মন্ডল (৪৩) বললেন, ঝড়ে আমাগের বাড়ি-ঘর সব ওই নদীতি গেছে। এহন স্বামী ছেলেপুলে নিয়ে এই বেড়িবাঁধ রাস্তার উপর আশ্রয় নিছি। এহ্যানে কোনো কাজ নেই। স্বামী গেছে ফকিরহাটে শ্রম দিতি। ঝড়ের পরে সরকার চাল দিয়ে সাহায্য করিলো। কিন্তু এখন আর কেউ আমাগে দ্যাখতেছে না। গাজীপাড়ার বাঁধের উপর বসবাসকারী গাজী মুজিবর রহমান, খোরশেদ গাজী, আবু তাহের সরদাররা বললেন, ঝড়ের পরেত্তে আজ চার বছর ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি। এখন বাধ্য হয়ে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা নৌকায় কিষেণ দিয়ে এবং নদীতে পোনা (রেণু) ধরে যা পাই তাই দিয়ে কোনরকমে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। সুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী আশরাফ হোসেন বলেন, সুতারখালী ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের দুই হাজারের বেশি মানুষ ঝড়ের পর থেকে আজও ওয়াপদা রাস্তার ওপর বসবাস করছে। আবার অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্রুত শিবসা মুখে বাঁধ না হলে ওই গ্রামগুলোর আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আর এসব মানুষ ঘর-বাড়িও বাঁধতে পারবে না। তবে বর্তমানে তাদের পুনর্বাসনের জন্য একটা তালিকা তৈরির কাজ চলছে। বর্তমানে এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকট। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ঘরে ঘরে কলেরা, ডায়রিয়াসহ পেটের পীড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হালিম বলেন, আইলার পর থেকে নলিয়ান নদীর দুই পাশে বাঁধের ওপর এখনও দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। ঘর বাঁধতে সরকার তাদের ২০ হাজার করে টাকা দিলেও তারা তা করেনি। তবে বর্তমানে তাদের একটা তালিকা তৈরির কাজ চলছে।