গ্যাস সঙ্কট কবলিত এলাকার জন্য কেন্দ ীয় ব্যাংকের জারি করা ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালায় শিথিলতা আনার প্রস্তাব দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘সামপ্রতিক সময়ে সাভারসহ কয়েকটি অঞ্চলে গ্যাস সঙ্কট ছিল তীব্র। তাই এ এলাকার শিল্প তাদের উত্পাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেনি। এ অবস্থায় ওই এলাকার শিল্প উদ্যোক্তারা কেন্দ ীয় ব্যাংকের নতুন নিয়ম মেনে ঋণ পরিশোধে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সুবিধার্থে এ অঞ্চলের জন্য নীতিমালা শিথিলের প্রস্তাব দেন শিল্পমন্ত্রী।
উদ্যোক্তারা জানান, দুই তিন বছর ধরে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট এবং ভর্তুকির চাপ কমাতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফায় বাড়ানোয় উত্পাদন খরচ বেড়ে শিল্প উদ্যোক্তারা চাপের মুখে রয়েছেন। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদ নেয়ায় উত্পাদন খরচ আরও বেড়ে গেছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে সঠিকভাবে টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে পারলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটতো। তবে ব্যবসা বাণিজ্যে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালায় সংশোধনী এনেছে। এতে ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যবসায়ীরা কম সময় পাচ্ছেন যা তাদেরকে বড় ধরনের চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অনেকে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ খেলাপির হাত থেকে বাঁচতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই ব্যবসার পরিধি ছোট করে ব্যাংক ঋণ দিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
তাছাড়া বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পগুলোর রফতানি আয় পেতে যে সময় অপেক্ষা করতে হয় সে বিবেচনায়ও এ নীতিমালা পরিপালন করা ব্যবসায়ীদের জন্য কষ্টসাধ্য। ফলে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত হচ্ছে না। কর্মসংস্থান না হলে সঞ্চয় হবে না আর সঞ্চয় না হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সরকারের কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জনেও বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১২ সালের ১৪ জুন ঋণ শ্রেণিকরণ, পুুন:তফসিলিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে মাস্টার সার্কুলার জারি করে। অবশ্য পরে আরো দুটি সার্কুলার জারি করে এর বাস্তবায়ন সময় এবং খেলাপি ঋণের ব্যাখ্যা দেয়া হয়। ঋণ শ্রেণিকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো- নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। গেল বছরের জুনে এক সার্কুলার জারি করে এ তিনটি ক্ষেত্রে তিন মাস করে সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে করে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমান, ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে হলে সন্দেহজনক এবং ৯ মাসের বেশি হলে তাকে মন্দ বা ক্ষতিমানে বিবেচনা করা হবে বলে বলা হয়। গত ডিসেম্বর থেকে নতুন এই নীতিমালা কার্যকর করা হয়। এদিকে, স্পেশাল মেনশনড একাউন্ট (এসএমএ) এর ক্ষেত্রে দুই মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি পালন করা অনেকের জন্যই কষ্টসাধ্য।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, টার্ম লোনে পুন:তফসিলিকরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিনবার পুন:তফসিল করার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম তফসিলিকরণের জন্য সর্বোচ্চ ১২ মাস, দ্বিতীয় তফসিলিকরণে সর্বোচ্চ ৯ মাস ও তৃতীয় তফসিলিকরণে সর্বোচ্চ ৬ মাস সময় দেয়া হবে। অর্থাত্ মোট ২৭ মাসের বেশি তফসিলিকরণ হতে পারবে না।
আর মেয়াদোত্তীর্ণ শ্রেণিকৃত ঋণে পুন:তফসিলিকরণের প্রথম আবেদনের ক্ষেত্রে বকেয়া কিস্তির অন্তত ১৫ শতাংশ অথবা মোট ঋণের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি ছোট হবে তা ডাউন পেমেন্ট (এককালীন পরিশোধ) হিসাবে পরিশোধ করতে হবে বলে সার্কুলারে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় পুন:তফসিলিকরণে বকেয়া কিস্তির অন্তত ৩০ শতাংশ অথবা মোট ঋণের ২০ শতাংশের মধ্যে যেটি ছোট হবে তা পরিশোধ করতে হবে। তৃতীয় পুন:তফসিলিকরণে বকেয়া কিস্তির অন্তত ৫০ শতাংশ অথবা মোট ঋণের ৩০ শতাংশের মধ্যে যেটি ছোট হবে তা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।
দেশের অর্থনীতি এখনো অনেকটাই রফতানি নির্ভর। দেশের শিল্পকারখানাগুলো গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও বিশ্ব মন্দায় উত্পাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। আবার অনেক সময় আন্তর্জাতিক ব্যবসায় দেরিতে বিক্রির টাকা পাওয়া যায়। তাই ঋণ শ্রেণিকরণের নতুন এ সিদ্ধান্তে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ প্রদানে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। ফলে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন তারা উচ্চ সুদের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতেই দিশেহারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন যে নীতিমালা গ্রহণ করেছে তার পেছনে যুক্তি দেখানো হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরের ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানের করা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে বা ব্যবসায়ীদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঋণ খেলাপি করে ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানের করতে গেলে অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। অথচ ব্যবসা বাণিজ্য যত প্রসারিত হবে তত উত্পাদন বাড়বে, দেশের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে এবং সামষ্টিক চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার বিপক্ষে নয় তবে যে সময়ে এ নীতিমালা করা হলো তা সময়োপযোগী নয়। যখন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য লাভজনক পরিস্থিতিতে থাকবে এবং বিনিয়োগ সহজ হবে তখন এ নিয়ম করা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের জন্য এ ধরনের নীতিমালা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ করে বিনিয়োগ করতে সাহস পাবে না। আর যারা ইতিমধ্যে ঋণ নিয়েছে তারা ব্যবসা সমপ্রসারণের পরিবর্তে ব্যাংক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেই মনোযোগী হবে।
