দেশের স্বাধীনতাকাল থেকেই রাষ্ট্র কাঠামোর প্রধান তিনটি স্তম্ভ নড়বড়ে ছিল। স্বাধীনতার পরও তা যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। আর এখন ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বাইরে থেকে তো বটে, ভেতর থেকেও স্তম্ভগুলিকে দুর্বল থেকে আরো দুর্বলতর করা হয়েছে। অথচ কী আশ্চর্য! যিনিই ক্ষমতায় গেছেন, মুখে বলেছেন এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হচ্ছে, শক্তিশালী করা হচ্ছে। এটা কত বড় মিথ্যাচার তা ভাবা যায় না। এটাও কি মুনাফিকি নয়?
আমাদের সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে যারা স্পষ্টবাদী তাদেরকে প্রায়শ ভাল চোখে দেখা হয় না। আপত দৃষ্টিতে তাদেরকে বেয়াদব বলে মনে হয় বা হতে পারে। কিন্তু যারা মনের কথা ও বিশ্বাস গোপন করে এবং মুখে বলে একটা আর করে আরেকটা, তাদের চেয়ে এসব স্পষ্টবাদী মানুষ হাজার হাজার গুণ ভাল। স্পষ্টবাদীদের চেনা যায় সহজেই। কিন্তু বিশ্বাসের সাথে প্রতারণাকারীদের চেনা কঠিন হয়। আমরা এসব চরিত্রের লোকদের ডাকি মুনাফিক বলে। তাদের কেউ কেউ কথায় কথায় ও উঠতে বসতে ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার বলে। তসবিহ দানায় কর্তার নাম জপে। কিন্তু কাজ করে ঠিক তার বিপরীত।
দেশে এখন গণতন্ত্র আছে কি নেই এই নিয়ে গবেষণা চলতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, যিনি বা যারা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না, তাদের অতীত জীবনের দিকে তাকালে বায়োডাটায় অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায়। তারাও এখন কথায় কথায় গণতন্ত্রের দোহাই দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, যে দেশে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার ইত্যাদি শব্দের প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে আমজনতা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত আছেন, সেখানেই এসব শব্দের খই ফুটছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র যদি অকার্যকর থাকে বা গোলক ধাঁধায় পড়ে, তাহলে এসব নীতির কথা বারবার উচ্চারণ করার মানে কি? এতে করে প্রকারান্তরে পরাধীনতা ও স্বৈরশাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে নাকি?
দেশে একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সেই কবেই উধাও হয়ে গেছে। সর্বত্র একটি কালো ছায়া ও কালো নকশা (নীল নকশা আর না বলাই উত্তম) ভর করে আছে আমাদের ওপর। এমতাবস্থায় যদি কেউ বলেন যে, আমরা ওয়ান ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি হতে দেব না, তাহলে সেই কথার কি কোন অর্থ আছে? কারণ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকে প্রশ্ন রাখেন, ওয়ান ইলেভেন নামার কি আর বাকি আছে?
আমরা আমাদের কাজেকর্মে ওয়ান ইলেভেনকেই স্বাগত জানাচ্ছি। আর মুখে বলছি, তাকে আসতে দেওয়া হবে না, প্রতিরোধ করা হবে ইত্যাদি। এটা কি দ্বিমুখিতা ও দ্বিচারিতা নয়? তথা মুনাফিকির পরিচায়ক নয়? ওয়ান ইলেভেনে অনেক অন্যায় ও অপকর্ম হয়েছে। কিন্তু তারপর যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারা কি তা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার সর্বোপরি বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন ও হচ্ছেন? শুধু এই সরকারের ওপর আমরা দোষ চাপাচ্ছি না। অন্য সরকারগুলিও কি সেভাবে পরিচালিত হয়েছে? সেভাবে পরিচালিত হলে ওয়ান ইলেভেনের মতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিই তো তৈরি হতো না।
গত ৪২ বছর যাবত্ আমরা কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সঠিকভাবে গড়ে উঠতে দেয়নি। যেই সরকারে গেছে, সেই দলীয়করণ ও নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভকে। অন্য স্তম্ভগুলিও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে পার্লামেন্ট, কোট-কাচারি, নির্বাচন কমিশন, সচিবালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ন্যায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান কাদায় ও দুর্বিপাকে পড়ে গেছে। পিএসসি নিয়েও অনেক কথা উঠেছে। দেশের স্বাধীনতাকাল থেকেই রাষ্ট্র কাঠামোর প্রধান তিনটি স্তম্ভ নড়বড়ে ছিল। স্বাধীনতার পরও তা যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। আর এখন ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বাইরে থেকে তো বটে, ভেতর থেকেও স্তম্ভগুলিকে দুর্বল থেকে আরো দুর্বলতর করা হয়েছে। অথচ কী আশ্চর্য! যিনিই ক্ষমতায় গেছেন, মুখে বলেছেন এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হচ্ছে, শক্তিশালী করা হচ্ছে। এটা কত বড় মিথ্যাচার তা ভাবা যায় না। এটাও কি মুনাফিকি নয়?
প্রতিটি রাজনৈতিক দল বা জোট ক্ষমতায় গিয়ে তার পহেলা নম্বর কর্তব্য নির্ধারণ করে যে, দেশে দারিদ্র্য বিমোচন কতটা হয়েছে তার হিসেব কষে। পরিসংখ্যান দেয়া। পরে সেই পরিসংখ্যানে অনেক ফাঁক-ফোকর ধরা পড়ে। যদিও এটাই আমাদের প্রধান জাতীয় সমস্যা। আবার শিক্ষার হার নিয়ে দেখা যায় তেলেসামাতি কাণ্ড। কেবল কথার ফুলঝুরি চলে, আর মধ্যখানে শিক্ষার মান দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতারও প্রচারণা চলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে। ফলাও করে বারবার বলা হয়। অথচ দেখা যায় যেই লাউ সেই কদু। পরক্ষণেই লাখ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানির কথা স্বীকার করা হয়। ফলে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা শুনে বিদেশি দাতারা বিভিন্ন অনুদান বন্ধ করে দেন। জাতির সাথে এই চালাকি ও প্রতারণারও একটা সীমা থাকা দরকার। যদিও গত ৪২ বছরে আগের তুলনায় খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে তা সন্তোষজনক নয়।
জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দল ক্ষমতায় যায়। ভোটের আগে ভোটারদের সামনে শত শত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়, এমন অঙ্গীকারও করতে দেখা যায় দলগুলিকে। যেন তারা আকাশের চাঁদও এনে দেবে। দুই দিনের এই পৃথিবীতে অহেতুক এত চালাকি করা হয় কেন সেটাই প্রধান জিজ্ঞাসা।।
সাময়িক সুযোগ-সুবিধার জন্য আমরা এমন কাজ করি, এমন কথা বলি যার সুদূরপ্রসারি প্রভাব, পরিণাম ও পরিণতি নিয়ে কখনো ভালভাবে ভেবে দেখি না। বিশ্বাসঘাতকতা বা মুনাফিকি করলে দীর্ঘমেয়াদে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। যদি আমরা কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হই, তাহলে জেনে রাখা দরকার, এই মুনাফিকির কারণেই ব্যর্থতা আসে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজকের দিনে তথা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু আজও কি আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও স্বাধীনতা পেয়েছি? প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছাড়া মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। যেই বঙ্গবন্ধু আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেন, জেল-জুলুম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করলেন, তাঁর সেই আরাধ্য গণতন্ত্র কি আমরা এতবছরেও পেয়েছি? ১৯৭৫ সালে আমরা দেখলাম, তাঁর কাঁধে বন্দুক রেখে কিভাবে অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেওয়া হল।
আজও তেমনি তৃণমূলের সংগঠন আওয়ামী লীগের কাঁধে বন্ধুক রেখে একটি অপশক্তি দেশকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যারা আসলে বিপ্লবী ও গণতন্ত্রে অবিশ্বাসী, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না। অথচ তারা অনবরত গণতন্ত্রের বুলি আওড়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দলের ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য ও প্রযোজ্য। এতে বোঝা যায়, তারা উদার গণতন্ত্রী তো নন, আসলে বর্ণচোরা গণতন্ত্রী।
বিশ্বাসের সাথে বেঈমানি করলে তার পরিণতি কখনো ভাল হয় না। যেই দেশে এরকম বেঈমান ও মুনাফিকের সংখ্যা বেশি ও প্রভাবশালী, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংকট এমনিতেই তৈরি হয়। জাতি সহজে তাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। দেশে ও সমাজে একটার পর একটা সংকট লেগেই থাকে।
যারা বেঈমান ও মুনাফিক তারা আল্লাহর কাছে ঘৃণার পাত্র। অনুরূপভাবে দেশ ও দশের কাছেও তাদের কোন সম্মান ও ইজ্জত থাকে না। কুরআন শরীফে সূরা ফাতিহার পরই আছে সূরা বাকারা। আর দ্বিতীয় এই সূরার একেবারে শুরুতেই মুনাফিকদের সম্পর্কে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। এমনকি আল মুনাফিকুন নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাও আছে। তবে সূরা আল-বাকারায় মুমিন ও কাফিরদের পরিচয় দেওয়ার পর তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তাদের মনের ভেতরে রয়েছে মারাত্মক ব্যাধি, অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাদের সেই ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব। কেননা তারা মিথ্যা বলছিল। তাদের যখন বলা হয়, তোমরা যমীনে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, না, আমরাই তো হচ্ছি সংশোধনকারী। জেনে রেখো, এরাই হচ্ছে যাবতীয় বিষয়ে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, যদিও তাদের এ ব্যাপারে চৈতন্যোদয় হয় না।’ (আল-বাকারা-১০-১২)।
পরবর্তী আয়াতগুলোতে মুনাফিকদের আরও পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে যে, আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন একাকি তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি। ঈমানদারদের সাথে আমরা ঠাট্টা করছিলাম মাত্র। বাংলাদেশেও এখন কিছু সংখ্যক গণবিরোধী ও মুনাফিক রাজনীতিক ও প্রভাবশালী মহল জনগণের সাথে মুনাফিকি আচরণ করে চলেছে। রক্ত নিয়ে খেলছে। ঠাট্টা-তামাশা করছে। সংকট সৃষ্টি করে সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মহাভারতের দুর্যোধনের মামা শকুনি এমনই একটি চরিত্র। নানা ছল-চাতুরি, কূট-কৌশল ছাড়া আর কিছুই বোঝে না সে। তার কারণে হিংসা-হানাহানি বৃদ্ধি পায়। শেষপর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশও এখন যেন একটি কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। নিরপরাধ মানুষও বলির পাঠা হচ্ছে।
মীরজাফর সিরাজ-উদ্দৌলার কাছে বলতো এক কথা। আর কাশিমবাজার কুঠিতে গিয়ে সংগোপনে ইংরেজদের সাথে শলাপরামর্শ করতো। চক্রান্ত করতো। বাংলাদেশও এখন এক গভীর চক্রান্তের শিকার। মুনাফিকরা আস্তিনের নিচে ছুরি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সম্পর্কে আমাদের সাবধান হতে হবে। সঠিক গণতন্ত্রপন্থিদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
শেক্সপিয়ারের ওথেলো নাটকে আয়াগোও এমনিই একটি চরিত্র। ডেভিলের চূড়ান্ত রূপ আঁঁকা যায় তাকে দিয়ে। যাকে বলে শয়তানের প্রতিমূর্তি। তাদের কারণে সব সমাজে ও দেশে শান্তি বিনষ্ট হয়। এখন মানুষের একটাই দাবি, আল্লাহ এসব মুনাফিকদের হাত থেকে আমাদের ও এ দেশটাকে রক্ষা করুন। রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি খুঁটিসহ অপর খুঁটিগুলি যাতে আমরা মেরামত ও শক্তিশালী করতে পারি সেই তওফিক দিন। নতুবা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রভৃতি সবকছুিই অরক্ষিত, অকার্যকর ও অপূর্ণ থেকে যাবে।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
