প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মো. আব্দুল জলিল আর নেই। হাজারো ভক্ত, অনুরাগী, শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় আব্দুল জলিল ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।
হূদরোগের চিকিত্সার জন্য গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অব্দুল জলিলকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে চিকিত্সকরা আব্দুল জলিলকে ৩০ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। এর আগে তিনবার বাইপাস সার্জারি হয়েছিল তার। হূদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে আব্দুল জলিলের মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নিয়ে আসা হবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর মরদেহ গ্রহণ করবেন। সেখান থেকে তার মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় মার্কেন্টাইল ব্যাংক-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, ১০টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে এবং সোয়া ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ সৃষ্টির নানা আন্দোলনে আব্দুল জলিল ছিলেন একজন অগ্রপথিক। নিজ যোগ্যতায় ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ১৯তম কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান আব্দুল জলিল। তার আগে আওয়ামী লীগের গত সরকারে টেকনোক্রেট কোটায় বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল জলিল চলতি নবম জাতীয় সংসদের নওগাঁ-৫ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
আব্দুল জলিল বেশি আলোচনায় আসেন গত বিএনপি সরকারের সময়ে। আওয়ামী লীগ তখন সংসদের বিরোধী দল। তিনি বিরোধী দলে থেকে সরকার পতনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেন। এবং সে সময় সরকার পতনের ‘ট্রামকার্ড’ আছে বলে দাবি করেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। এই ‘ট্রাম্পকার্ড’ শব্দটি তখন মুখে মুখে ছিল। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট তারিখে সরকার পতন হয়নি। সেই আলোচনার পর দেশের দুই রাজনৈতিক দলের সংলাপ নিয়ে আবার আলোচনায় আসেন জলিল। বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আব্দুল জলিলের ‘সংলাপ’ ছিল সে সময়ের সবচে আলোচিত বিষয়। একান্ত সেই সংলাপের কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কোন সমাধানে আসতে পারেনি তারা।
গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর একটি চিঠিতে দল ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে নিয়ে নানা বিরূপ মন্তব্য করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন জলিল। মুক্তি পাওয়ার পর তাকে আর দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়নি।
আব্দুল জলিল ১৯৩৯ সালের ২১ জানুয়ারি নওগাঁ সদর উপজেলার চকপ্রাণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবন শুরু। পরে নওগাঁ কে. ডি. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। সেখানে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। ১৯৬০ সালে আব্দুল জলিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন। এরপর তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতে লন্ডনে যান।
কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। পরে তিনি স্থানীয়ভাবে নওগাঁয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরে আব্দুল জলিল ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি ১৯৮৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নওগাঁ-৫ (সদর) আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৬ সালের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে গভর্নর মনোনীত হয়েছিলেন এবং নওগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসাবেও একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতির শোক
আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান গতকাল এক শোক বার্তায় বলেছেন, আবদুল জলিলের মৃত্যুতে দেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রবীণ রাজনীতিবিদকে হারালো। জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য জাতি তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল এক শোক বার্তায় বলেন, আবদুল জলিলের মৃত্যুতে জাতি একজন দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও জনপ্রিয় রাজনীতিককে হারালো। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদুল জলিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে আবদুল জলিলের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল মাগরিবের নামাজের বিরতির পর স্পিকার মো. আবদুল হামিদ সংসদে আবদুল জলিলের মৃত্যুর খবর জানিয়ে সংসদের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। স্পিকার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি এক শোক বিবৃতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে সৈয়দ আশরাফ বলেন, মরহুম মো. আব্দুল জলিল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন, সুমহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে এবং রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনগর্ঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যথোচিত অবদান রেখেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর সামরিক স্বৈরশাসকের রোষানলে পড়ে তাকে অনেক অত্যাচার, নির্যাতন ও কারাবরণ সহ্য করতে হয়েছে; কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম থেকে তাকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমৃত্যু তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে এবং এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একজন ত্যাগী, দক্ষ, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক সংগঠককে হারালো ও জনগণ তাদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ সম্পন্ন এক অকৃত্রিম সুহূদ, বহুমাত্রিক প্রতিভামন্ডিত বিরল রাজনীতিককে হারালো।
এরশাদের শোক
জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গতকাল এক শোক বার্তায় বলেন, আব্দুল জলিলের মতো একজন নেতার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা আর পূরণ হবার নয়।
জাতীয় পার্টির (জেপি) শোক
আব্দুল জলিলের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, আব্দুল জলিল ছিলেন একজন অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহারের রাজনীতিবিদ; যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে সকলের কাছেই জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তার মৃত্যুতে দেশ একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও দেশপ্রেমিককে হারালো। বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম শোক বাণীতে বলেন, আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও জনপ্রিয় রাজনীতিককে হারালো।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, চিফ হুইপ মো. আবদুস শহীদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুৃল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়য়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ এবং সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাতীয় শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বাংলাদেশ নারীমুক্তি আন্দোলন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা মো. আবু কাওছার, সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ.এম.বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাংলাদেশ আখচাষি ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আব্দুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী দুলাল পৃথক পৃথক শোক প্রকাশ ও তার পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
ইত্তেফাক পরিবারের শোক
দৈনিক ইত্তেফাকের দীর্ঘদিনের সুহূদ বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে ইত্তেফাকের সংবাদকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকবান্ধব ছিলেন। (প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আমাদের নওগাঁ প্রতিনিধি)
