আজ নারী জাগরণ সমাবেশ দেশব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা আসছে
এক মাসের আন্দোলনের পর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ আবারো নতুন করে শপথের অগ্নিশিখা প্রজ্বলন করলো। ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে আন্দোলনে যোগ’ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির রায় এবং তা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করলেন মঞ্চের সংগঠকরা। ঐতিহাসিক সোহ-রাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তনকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করতে শপথ নিলো তারুণ্য। অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বিজয়ী হয়ে ঘরে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়ে সর্বস্তরের জনগণকে ঐ নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। জনগণকে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন আন্দোলনরতরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তনের পাশে সমাবেশে এ শপথ গ্রহণ এবং আহ্বান জানান গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের অনুপ্রের-ণায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, “সারা বাংলায় যে মানুষেরা সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানাই সবাইকে। গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকেও আমরা তাদের পাশে দাঁড়াবো। প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় এ অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।”
তিনি বলেন, “আমাদের আন্দোলন অহিংস আন্দোলন। কোনো নৈরাজ্য যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যে কোনো ধরনের অপপ্রচার, প্ররোচনা, উস্কানি বা মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হবেন না। এমন কিছুই আমরা করবো না, যা রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জনগণের জানমালের ক্ষতি সাধন করে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হূদয়ে লালন করে, ৭ই মার্চের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরবো।”
ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার বলেন, “আমাদের লড়াই শুরু হয়েছে মাত্র। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধের শুরু হয়েছিল, তারই সম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করতে আজ (গতকাল) ২০১৩’র ৭ই মার্চ আমরা শপথ গ্রহণ করবো।”
শপথ বাক্যে ইমরান বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় ও তা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবেই। জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো। যুদ্ধাপরাধীদের সকল অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বয়কট করবো, যুদ্ধাপরাধীদের সকল গণমাধ্যম বয়কট করবো।’
সমাবেশে উপস্থিত জনতা হাত উঁচিয়ে তার সাথে শপথ গ্রহণ করেন। এসময় ইমরান বলেন, আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে নতুন সূর্য শিখা জ্বলবেই। জনতার সংগ্রাম চলবেই।
সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু আপোষ না করার, বিশ্বাসঘাতকতা না করার কথা বলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তরুণ প্রজন্মের সংগ্রাম চলছে। এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সকলকে সহায়তা করতে হবে।
সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘এই রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ফলে সারা জাতি উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। আবার সারা জাতি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে এখানে সমবেত হয়েছে। জাতি আজ ইতিহাস বিকৃতির পালাবদল থেকে বেরিয়ে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াত-শিবির আমাদের জাতীয় মসজিদকে অবমাননা করেছে। তারা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। আমরা আমাদের জাতীয় মসজিদকে পাকিস্তানের লাহোর মসজিদ হতে দিতে পারি না। তাই সব ধর্মপ্রাণ মানুষকে এদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে, যাতে করে এরা দেশের কোনো মসজিদে হামলা বা অগ্নিসংযোগ না করতে পারে।’
জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির বলেন, জামায়াত-শিবির সারা দেশে যে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছে তা প্রতিহত করতে ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের ষড়যন্ত্রে পা দিলে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, ‘গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সব জায়গায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানানোয় তিনি নাকি জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। রাজাকারের গাড়িতে যদি জাতীয় পতাকা উড়তে পারে, তবে দেশের হাজার হাজার গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়বে। যারা জাতীয় পতাকায় আগুন দেয়, পতাকা ছিঁড়ে ফেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলো না কেন?’
তিনি বলেন, ‘সারা বাংলাদেশ এক একটি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। আমাদের আন্দোলনের ফলেই ট্রাইব্যুানালের সংশোধন হয়েছে। দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার করার পথ তৈরি হয়েছে। লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আরো রাজাকারের ফাঁসি বাকি আছে।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই বয়সে আপনি সংযত হোন। তা না হলে জনগণ আপনাকে প্রতিহত করবে। আপনি ও জেনারেল জিয়া সংবিধান সংশোধন করে দেশকে সামপ্রদায়িক দেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। জেনারেল-মিনারেলের কথা জনগণ শুনবে না। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছেন। প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ হবে, তবুও কোনো স্বৈরাচারকে ক্ষমতা দেয়া হবে না।’
ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দীকী নাজমুল আলম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষণহীন-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য। আর আমাদের এ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হলো রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য। বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এস এম শুভ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল, জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুসমত, ছাত্র ঐক্য ফোরামের আহবায়ক সোহান সোবহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ।
২২ মার্চ পর্যন্ত গণস্বাক্ষর :মঞ্চের ছয় দফা দাবির পক্ষে জনগণের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু হয়। গতকাল এ কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা হয়েছিল। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার কারণে এ কর্মসূচিতে সময়সীমা আগামী ২২ মার্চ বাড়ানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইমরান বলেন, বিগত কয়েকদিন যাবত দেশব্যাপী জামায়াত-শিবির যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে, তাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণ গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তাই আগামী ২২ মার্চ পর্যন্ত কর্মসূচির সময়সীমা বাড়ানো হলো। জনগণকে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনার একটি স্বাক্ষর এই দাবি আদায়ের জন্য একটি সাহসী প্রতিনিধি।
হরতালবিরোধী মিছিল :শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে গতকাল সকালে জামায়াতের ডাকা হরতালের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সকাল নয়টার দিকে মিছিলটি শাহবাগ থেকে বের হয়ে মত্স্য ভবন, প্রেসক্লাব, পুরানা পল্টন হয়ে আবারো শাহবাগে ফিরে আসে। মিছিলে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ এবং সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেন আন্দোলনরতরা।
এর আগে সকাল সোয়া আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিন থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একটি হরতাল বিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসিতে শেষ হয়। সেখান থেকে ছাত্র নেতা-কর্মীরা মঞ্চের মিছিলে যোগ দেন।
শিশু কণ্ঠে সাত মার্চের ভাষণ মুগ্ধ করলো জনতাকে :১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণই মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত। ২০১৩ সালে একই স্থানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকালের গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে শিশু অপূর্ব বঙ্গবন্ধুর অনুকরণে সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেয়। শিশুর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে মুগ্ধ হন উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যেরকম অভিবাদন জানিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন প্রায় একইরকম প্রতিক্রিয়া জানান সমবেত জনগণ।
সমাবেশশেষে মঞ্চে সঙ্গীত, নৃত্য, নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের পরিবেশনায় মুগ্ধ হন আন্দোলনরত তরুণ এবং উপস্থিত জনতা।
দেশব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা আসছে আজ :গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে দেশের সকল বিভাগে এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। আজ বিকাল তিনটায় শাহবাগের মঞ্চে নারী জাগরণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আজকের সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচীর রূপরেখা এবং দিন-সময় ঘোষণা করা হবে বলে গতকাল ঘোষণা করেছেন ইমরান এইচ সরকার।
সকল নারী গার্মেন্টস কর্মীসহ নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমাবেশে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বিকাল তিনটার আগেই ছুটি দেয়ার জন্য গার্মেন্টসসহ সংশ্লি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রতি আহবান জানানো হয়।
