গাইবান্ধার পল্লীতে দলবেধে মাছ শিকার হারিয়ে যাচ্ছে

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২১:৪৪
গাইবান্ধার পল্লী এলাকায় শুকনা মৌসুমে বিল, জলাশয় ও নদীতে ঐতিহ্যবাহী আর আনন্দময় দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকার ‘বৈদ’ হারিয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে ‘বৈদ’ নামের এই মাছ ধরা চলে আসছে। ‘বৈদ’ নামে প্রকৃত অর্থ কি জানা না গেলেও মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বিশেষ শিংগার (বাঁশির) শব্দে এ অঞ্চলের মাছ শিকারীদের দলবদ্ধ মাছ ধরা গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার সাথে এই (বৈদ) নামের সংশ্লিষ্টতা আছে। সাধারণত: ফাল্গুন মাস থেকে শুরু হয়ে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত যখন এ অঞ্চলের বড় বড় বিল, নদী ও জলাশয়ে পানি কমে যায় তখন দলবদ্ধ হয়ে ‘বৈদ’ নামের এ মাছ ধরার বা শিকারের প্রকৃত মৌসুম। জেলার ৬টি উপজেলায় রয়েছে পৃথক পৃথক সৌখিন এই মাছ শিকারীর দল। ‘বৈদ’ দলের আলোচনার ভিত্তিতে মাছ শিকারের নির্দিষ্ট জলাশয়, তারিখ, সময়, যাত্রার স্থান নির্ধারণ করা হয়। পরে গ্রামের হাট-বাজারে বিশেষ ওই শিংগা ফুকিয়ে তা জানিয়ে দেয়া হয়। এই ‘বৈদ’ দলের একজন দলনেতা থাকেন। যার কাছে থাকে একটি শিংগা (বাঁশি)। যা দিয়ে বিউগলের মতো উচ্চ স্বরে শব্দ বের হয় এবং অনেক দূর থেকে তা শোনা যায়। নির্ধারিত স্থানে যথাসময়ে শিংগায় ফু দেয়া হয় বার বার। শিংগার সেই আহ্বানে নিজ নিজ পছন্দ মতো মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম পলো, হ্যাংগার জালি, পলো জালি, হ্যাংগা, মুঠ জাল, কোঁচা, ক্যাটা, তৌরা জাল, ঝাঁকি জাল ইত্যাদি নিয়ে সমবেত হতে থাকে মত্স্য শিকারীরা। এরপর নির্দিষ্ট বিল বা জলাশয় অভিমুখে মাছ ধরার সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে মিছিলের মতো করে যাত্রা শুরু হয়। যাত্রা পথেও শিংগা ফুকিয়ে ফুকিয়ে চলা, আর সে শব্দে পথে পথে মাছ শিকারীরা সামিল হতে থাকে মাছ ধরার ওই ‘বৈদ’ এর মিছিলে। এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই, যে কেউ এতে সামিল হতে পারে। সে কারণে একটি বৈদের দল যখন কোন বিল বা নদীতে একযোগে সারিবদ্ধভাবে মাছ শিকারে নামে তখন একটি বৈদের দলে মাছ শিকারীর সংখ্যা কমপক্ষে ৫শ’ থেকে দাঁড়ায় এক হাজার বা তারও বেশি। বৈদে মাছ ধরা চলে সকাল থেকে বিকেল ৫টা অবধি। এতে কেউ অনেক মাছ পায় আবার অনেকে একটি মাছও পায় না। কিন্তু তাতে বৈদ শিকারীদের কোন দুঃখবোধ নেই। কেননা এখানে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দটাই মুখ্য। মাছ প্রাপ্তিটা মূল বিষয় নয়। কিন্তু এখন আর সেই দৃশ্য গাইবান্ধার গ্রামাঞ্চলে চোখে পড়ে না।