উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রা.বি) ক্যাম্পাস দীর্ঘ ১১ দিন ধরে অভিভাবক শূন্য। বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের তিনটি প্রশাসনিক শীর্ষপদ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের মেয়াদ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। তাই আগের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ অফিস করছেন না। এমতাবস্থায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বায়ত্তশাসিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এভাবে প্রশাসনিক শূন্যতা এবারই প্রথম। এর আগে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানপন্থি উপাচার্য সাজ্জাদ হোসাইন দেশত্যাগ করায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিনকে দুই দিনের জন্য বেসরকারিভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে নিয়োজিত করা হয়েছিল বলে শোনা যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে উপাচার্য না থাকলে উপ-উপাচার্য, আবার উভয় পদ শূন্য থাকলে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। কিন্তু এবার তিনটি প্রশাসনিক শীর্ষপদ একই দিন থেকে শূন্য হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১৯৭৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে এসব পদে নিয়োগের বিধান স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। অধ্যাদেশের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সচিব মেয়াদ শেষের আগেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় এসব পদে নিয়োগের জন্য চ্যান্সেলর ও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকার ও একজন সফল শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্বে থাকাবস্থায় এরকম শূন্যতা অনাকাঙ্ক্ষিত বলে শিক্ষক-কর্মকর্তারা মনে করেন। এছাড়া দেশব্যাপী চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় অভিভাবকহীন বিশ্ববিদ্যালয়টির হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অভিভাবকেরা চরম উত্কণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
শিক্ষক-কর্মকর্তারা জানান, অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি কাজে উপাচার্যের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুস সোবহান ও উপ-উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ নুরুল্লাহ শুধু দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রয়েছেন। তবে উভয়ে আগেরমত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর মূল সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রেও উপাচার্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক শূন্যতায় অনেক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলও আটকে রয়েছে। কারণ পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করতে উপাচার্যের অনুমোদনে ট্যাবুলেটর নিয়োগ করতে হয়, তেমনিভাবে কোন বিভাগের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও উপাচার্যের অনুমোদন প্রয়োজন। সরকার যেখানে সেশনজট দূর করার কথা বলছে, সে অবস্থায় এখানে ঘটছে উল্টোটা।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, সরকার বিদায়ী উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মেয়াদ আর বাড়াতে চায় না। কারণ বিগত চার বছরে তারা নতুন কোনো বিভাগ খোলেননি, আগের সরকার আমলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার করেননি। উপরন্তু শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে স্থানীয়ভাবে সরকার সমর্থক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দূরত্ব সৃষ্টির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় সাড়ে তিনশ’ নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরও শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে জামায়াত-বিএনপির কাছে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়কে সরকার ভালোভাবে নেয়নি। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রশাসনিক শূন্যতায় কাজকর্মে স্থবিরতার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
