‘কামের বেলায় সমান ট্যাকার বেলায় অর্ধেক’

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২২:২৬
ধানের চাতালে কর্মরত নারী শ্রমিকরা বছরের পর বছর মজুরি বৈষম্যের শিকার। পুরুষের সমান কায়িক পরিশ্রম, কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি কাজ করেও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা। কোন কোন চাতালে নারী শ্রমিকদের পুরুষের চেয়ে অর্ধেক মজুরি দেয়া হয়। কিন্তু বঞ্চিত এসব নারীর কথা শোনার কেউ নেই। ঈশ্বরদী অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম চালের মোকাম ঈশ্বরদীতে প্রায় ৭ শতাধিক ধানের চাতালে পুরুষদের পাশাপাশি ৫ সহস্রাধিক নারী শ্রমিক কাজ করেন। ধান সিদ্ধ থেকে শুরু করে চাল বস্তা ভর্তি করা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের রয়েছে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কঠোর কায়িক পরিশ্রম করছেন তারা। সমানতালে পরিশ্রম করলেও মজুরির ক্ষেত্রে তারা চরম বৈষম্যের শিকার। ঈশ্বরদীর ব্যস্ততম জয়নগর মোকামে চাতালের নিয়মিত শ্রমিক রুকশান আরা জানান, ‘ওনাদের মতো আমরাও প্রতিদিন ধানে পা দেয়া, চাতাল ঝাড়ু দেয়া থেকে শুরু করে সব কাজই করি। তয় মজুরি পাওয়ার সময় আমরা পাই অর্ধেক।’ একই কথা জানালেন হাফিজা খাতুন। আক্ষেপ করে হাফিজা বলেন, ‘কামের বেলায় সমান, ট্যাকার বেলায় অর্ধেক।’ আমেনা বেগম জানান, দফায় দফায় পুরুষদের মজুরি বাড়লেও তাদের এখনও খুদ আর কুড়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অন্যতম সবজি উত্পাদন এলাকা মুলাডুলি ও ছলিমপুর ইউনিয়নের কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরা জানান, পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে সেখানে একই কাজ নারী শ্রমিকদের দেয়া হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শ্রমিক রহিমা জানান, ‘পুরুষদের পাশাপাশি প্রতিদিন তিনি সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শিম ক্ষেতে কাজ করেন। পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি ২৮০ টাকা দেয়া হলেও তাকে দেয়া হয় মাত্র ১৩০ টাকা।’ রেবেকা খাতুন জানান, মুলাডুলির শিম, বেগুন, ঢেঁড়স, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি উত্পাদনে প্রায় ২ হাজার নারী শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন। নারীরা সকলেই মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে চরমভাবে বৈষম্যের শিকার। আদিবাসী নারী শ্রমিকদের বেলায় মুলাডুলিতে আরও বেশি বৈষম্যের অভিযোগ পাওয়া যায়। একই কাজ করিয়ে আদিবাসী নারী শ্রমিকদের দেয়া হয় মাত্র ৮০ থেকে ১২০ টাকা। জীবন-জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়েই অন্যায় এ নিয়ম মেনে নিয়েছেন বলে তারা জানান। আরও জানান, মুলাডুলি ইউনিয়নেই শুধু ৩ শতাধিক আদিবাসী নারী শ্রমিক কৃষিকাজে সরাসরি সম্পৃক্ত। ধান রোপণ, পরিচর্যা ও মাড়াই থেকে শুরু করে সবজি ফসলের মাচা তৈরি এবং পরিচর্যার কাজ করেন। আবার বাজারজাতকরণে এসব আদিবাসী নারী শ্রমিক কাজ করেন। তারপরেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। সাধারণ নারী শ্রমিকদের চেয়েও আদিবাসীদের কম মজুরি দেয়া হয়। নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জোবাইদা খাতুন জানান, সরকারিভাবে নির্দেশনা না থাকায় কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না।