কোন গ্যারান্টি বা জামানত নয়, বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা। ঋণ গ্রহণকারীরা এ টাকা দিয়ে পণ্য আমদানি করে ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত গোডাউনে রেখেছেন। কথা ছিলো পণ্য বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা সুদে আসলে ফেরত দেবেন। ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে আমদানিকারকরা পণ্য বিক্রিও করেছেন। কিন্তু ব্যাংকের এক টাকাও ফেরত দেননি। বর্তমানে এ সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকাই খেলাপি।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখায় এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় শাখার আট কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে খাতুনগঞ্জ শাখার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপকসহ তিন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে আরো বেশ কয়েকটি শাখায় বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত চলছে। এসব ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগ্রাবাদ শাখায় তদন্তে লোন এগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট বা এলটিআরের মাধ্যমে সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা সনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, শাখা ব্যবস্থাপক ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালকের নির্দেশে ওইসব ঋণ দিয়েছেন। শাখার কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, এ ঋণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সাবেক দুজন পরিচালক এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জড়িত। তারা বিভিন্ন সময় কিছু ব্যবসায়ীকে এলটিআর দেয়ার জন্য শাখা কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের চাপে এলটিআর দিয়ে ব্যাংক এখন আর ওইসব ঋণ আদায় করতে পারছে না। ফলে এই ঋণকে ক্ষতিকারক বা মন্দ ঋণ হিসাবে সনাক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকটি এখন লোকসানের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ব্যাংকেই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামপ্রতিক সময়ে একটি তদন্তেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এলটিআর অর্থাত্ গ্রাহকের বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব ঋণে কোনো সম্পদ জামানত দিতে হয় না। গ্রাহক তার বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পণ্য আমদানি করে। আমদানিকৃত পণ্য থাকে ব্যাংকের গোডাউনে। ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে গ্রাহকের পণ্য বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করার কথা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রাহক ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে গোডাউন থেকে পণ্য বের করে বিক্রি করলেও ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়নি। একপর্যায়ে ওইসব ঋণ ব্যাংকের খাতায় খেলাপি হয়ে গেছে। এ ঘটনার জন্য ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
সোনালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ডিজিএম নিজাম উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, ‘অনেক বড় বড় গ্রাহক এসব ঋণ নিয়েছেন। ঋণ ফেরত পাবার বিষয়ে তাদের সঙ্গে এখন আমাদের দেনদরবার চলছে। আশা করছি সহসাই এসব ঋণ আদায় করা যাবে। এসব ঋণের বিপরীতে এখন জামানত নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
এদিকে সোনালী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে সাত কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটন করেছে ব্যাংকের একটি তদন্তকারী দল। কয়েকটি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির বিপরীতে শাখা থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি এলসির একটি মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে ওই এলসির আর গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। ফলে ওই মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির বিপরীতে কোন ঋণ নেয়ার সুযোগও নেই। তারপরেও মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে। এলসির ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ব্যাংক। এলসির বিপরীতে চলতি মূলধন ও প্যাকিং ক্রেডিট (কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ) ঋণও দিয়েছে।
ভুয়া এলসির বিপরীতে ঋণ দেয়ায় এর মাধ্যমে কোন পণ্য আমদানি হয়নি। ফলে কোন পণ্য রফতানিও হয়নি। এতে রফতানির কোন মূল্যও দেশে আসেনি। অথচ রফতানির নাম করে ব্যাংক থেকে সাত কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে।
এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক সেলিম আহমেদসহ তিন কর্মকর্তাকে প্রথমে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে ।
