প্র জ ন্ম আ ই ক ন

পোশাকশিল্পে অনুকরণীয় যিনি

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ১৯:৫০
সেই আদিকাল থেকেই নারী মানেই যেন সাজানো কোনো এক জীবন্ত পুতুল। চার দেয়ালেই যার বিচরণ। ছোটবেলা থেকেই যার স্বপ্ন সুনিপুণা ঘরণী হওয়া। কিন্তু সময় এখন অনেক পাল্টেছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর বিচরণ এখন সবখানেই। শিক্ষা কিংবা যেকোনো পেশাতেই আজ শাণিত প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে নারী। পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে আজ মহাকাশ জয়েও ছুটছেন নারীরা। কিন্তু নারীর এই জয় জয়কারের মাঝেও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রটিতে নারীর অবস্থান আজ কতটুকু? জীবনের নানা ক্ষেত্রে নিজের মতামত কিংবা সিদ্ধান্তকে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন একজন নারী? নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নারীর এই বর্তমান অবস্থানে যিনি দাঁড়িয়েছেন অনেকটা স্রোতের বিপরীতে, নিজের মেধা এবং মননের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফলতার শীর্ষে, তিনি হচ্ছেন দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড-এর ডিরেক্টর বিদ্যা অমৃত খান। যিনি নিজের প্রচেষ্টায় নিজেকে উন্নীত করছেন নারীদের এক অনুপ্রেরণার জায়গায়। ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্টস হিসেবে দেশ গার্মেন্টস যাত্রা শুরু করে। এম নুরুল কাদের ছিলেন এই ক্ষেত্রে পথিকৃত্। ১৯৭৮ সালে এখান থেকে ১৩১ জন কর্মচারীকে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াতে পাঠান একটা প্রশিক্ষনের জন্য। গার্মেন্টসের সব ধরনের বিষয়ের উপর তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেখানে। ছয় মাস পরে দেশে এসেই চট্টগ্রামের কালুরঘাটে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। এম নুরুল কাদের সব সময়ই দেশের জন্য কিছু করতে চাইতেন, তাই চেয়েছেন এখানেই কিছু করবেন। আর যখন এই ফ্যাক্টরিটা যাত্রা শুরু করে সে সময়টাতেই জন্মগ্রহণ করেন বিদ্যা অমৃত খান। ২০০০ ইংল্যান্ডের রোদিয়ান স্কুল থেকে এ-লেভেল পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনার পর কিংস কলেজ লন্ডন থেকে এলএলবি-তে অনার্স শেষ করেন তারপর ইংল্যান্ডের ইন’স অব কোর্ট স্কুল অফ ল’ থেকে বার অ্যাট ল ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। এর মাঝেই তিনি বাবা এম নুরুল কাদেরকে হারান। বিদ্যা অমৃত খান যখন দেশে ফিরে আসেন তখন একেবারেই নতুন একটি পরিবেশের সাথে পরিচয় ঘটে তার, প্রায় সাত বছর পরে এসে এখানকার পরিবেশটা বুঝার চেষ্টা করেন তিনি। এখানে এসেই নারী নির্যাতন বা মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করবেন এমনটা ভাবার চেয়ে কেন জানি ব্যবসার দিকেই তার আগ্রহটা ছিল বেশি। নব্বই দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রামে গার্মেন্টস যখন ক্ষতির দিকে তখন তার মা এবং ছোট ভাই ব্যবসা দেখার জন্য চট্টগ্রাম যেতে অতটা আগ্রহী ছিলেন না। তারপরে তিনি ভাবলেন বাবার স্মৃতিটা ধরে রাখা দরকার। তারপর নিজেই একদিন চট্টগ্রামে চলে যান সকালের ফ্লাইটে, পুনরায় শুরু করেন এই ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টসটির পুনরুদ্ধারের কাজ। গত কয়েক বছর যাবত সেভাবেই চলছে। তাহলে কি ঐতিহ্য রক্ষার্থেই গার্মেন্টস শিল্পে আপনার প্রথম আগ্রহ জন্মে—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যা অমৃত খান বলেন, ‘সেটা একদিক দিয়ে ঠিক, আমি আমার বাবার খুব ভক্ত ছিলাম। তিনি যে কাজটা শুরু করেছিলেন, সেটা যেন ঠিকঠাক করে যেতে পারি, এটা চেয়েছি। এর বাইরে আমার নিজের একটা জিদ ছিল, কেন কাজটা আমি পারব না? ঢাকার বাইরে থাকুক আর যাই হোক, বাবা তো পেরেছিলেন। সুতরাং আমাকেও পারতে হবে। এমন চিন্তা ভাবনাটাও আমার মাঝে কাজ করেছে।’ সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়ে এভাবেই নিজেকে জড়িয়েছেন গার্মেন্টস শিল্পের সাথে। তারপরই তার এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি আমরা। যখন শুরু করেছিলেন নতুন করে, কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা এসেছিল? কীভাবে সব কাটিয়ে উঠেছিলেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি আমার নিজের পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চেয়েছি। একটা কাজ করছি, সেটা কীভাবে করছি তার চেয়ে বড় বিষয় এটা যেন আন্তর্জাতিক মানের হয়। যা বলছিলাম, যখন আমি অফিসে নিয়মিত যেতাম না, তখন কিন্তু অনিয়ম জেঁকে বসেছিল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক কর্মচারী ছিল। আমি কিন্তু দুই বছর চট্টগ্রামে থেকে গার্মেন্টসেই প্রতিটা পার্টস এবং যন্ত্রপাতির খুঁটিনাটি বুঝতে চেষ্টা করেছি। কোন কাপড়টা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটা কীভাবেই বা শেষ হচ্ছে বুঝতে চেয়েছি। আর সেই সময়েই একজন জার্মান কনসালটেন্ট পেয়ে যাই আমার সাথে। তিনি অনেক সময়সচেতন ছিলেন। কোনো কিছুতেই ছাড় দিতে নারাজ তিনি। তার সাথে কাজ করতে গিয়েই অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আসলে একজন অভিজ্ঞ লোকের সহায়তা আমার নিতেই হয়েছে। একটা জিনিসের পেছনে লেগে থাকলে সফলতা অবশ্যই আসবে, যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা অনেকেই করতে চান না। তরুণ বয়সে আমরা একরকম উত্সবের আমেজে থাকতেই পারি তাই বলে অসচেতন হলে চলে না। তাই কাজের প্রতি দায়িত্ববোধের পরিচয়টা সবার আগে দিতে হয়।’ ব্যবসায় খুব অল্পদিনে নিজেকে সংযুক্তির ক্ষেত্রে নিজের নেতৃত্বের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিদ্যা অমৃত খান বলেন, ‘কেন জানি আমাদের দেশে মহিলাদের আটকে রাখতে চাওয়ার একটা প্রয়াস আছে, এটা যদি ঠিক না কোনোমতেই। দেশে থাকতে থাকতেই বুঝলাম, এখানে উত্থান-পতন আছেই। এর মাঝেই কিন্তু কাজ করতে হবে, সেই ভাবনা থেকেই কাজটা শুরু। তবে বাবা বা ভাইয়ের সাথে কাজ করার কোনো সুযোগ হয়নি আমার। কারও প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকার কারণেই এখানের সব কাজ আমার একা করতে হয়, সব সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হয়। এটা কিন্তু বড় একটা বিষয়। সত্যি বলতে আমি কখনও কারো প্রভাবে থাকতে চাইনি, নিজেই নিজেকে পরিচালিত করতে চেয়েছি।’ নিজের চিন্তাগুলোর সাথে এখানে কাজের মিল খুঁজে পাওয়া প্রসঙ্গে বিদ্যা অমৃত খান বলেন, ‘আসলে আমি চেয়েছি এখানেই কিছু করতে হবে। সত্যি বলতে অনেকে দেশে কাজ করতে চাই না। ব্রেইন ড্রেইনের মাধ্যমে অনেক কিছুই পাচার হয়ে যাচ্ছে বাইরে। যদি আমাদের সেরা তরুণরা আমাদের দেশেই কিছু করতেন তাহলে কিন্তু অনেকটা পরিবর্তন হতে পারত। এখানেই বলা দরকার, সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। করলে অনেকেই হয়তো এই পরিবেশে কাজ করতে ফিরে আসত।’ আপনার বাবা আপনার অনেক কাছের মানুষ ছিলেন, তাকে হারানোর পরেও আপনি সব সামলে নিয়েছেন—এটা কীভাবে সম্ভব হলো? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার সাথে আসলে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। মনে আছে, এক রবিবারে আমাকে তিনি বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে আসেন ব্রাইটনে। তারপরের সপ্তাহেই একদিন সকালে মা-বাবার সাথে হাঁটছিলাম, হঠাত্ দেখি বাবা নেই, তিনি মাটিতে পড়ে আছেন। অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হলো। মা তখনও আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন যে কিছু হবে না তোমার বাবার। হাসপাতাল করিডরে নার্স যখন এসে আমাকে খবরটা দিলেন কিছু সময়ের জন্য থ মেরে গিয়েছিলাম, কিন্তু সামলে নিতে পেরেছিলাম নিজেকে। দেশে যখন ফিরে আসি, এয়ারপোর্টে নেমে প্রথমে অনেক কেঁদেছিলাম, তারপরও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। লোকে যাই বলুক, আমি কোনোদিনই বাবাকে ভুলতে পারব না। আজ যদি তিনি আমার এই কাজের জগতটা দেখতেন খুশি হতেন জানি। সব সময় দেশের জন্য ভাবতেন তিনি, অন্যভাবে চিন্তা করতেন সব কিছু। সেই দিক দিয়ে আমি সৌভাগ্যবান যে আমি নুরুল কাদের সাহেবের মেয়ে। চট্টগ্রামের একটা পুরোনো চা-ওয়ালাও হয়তো তার পরিচিত ছিল, তাদের কাছে গেলে বাবার সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। এভাবেই বাবার স্মৃতি আমার মাঝে রয়ে গেছে। জীবনটা তো কেটেই যাচ্ছে, কোনোকিছুই থেমে থাকছে না।’ বিদ্যা অমৃত খানের কাছে পরিশ্রমের মূল উত্স এই পরিবেশ। এখানেই কাজ করেছেন এখান থেকেই শিখেছেন—পরিশ্রম কী এবং কেন দরকার। সাফল্যের দিকটা কীভাবে দেখবেন আপনি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা অনেক আপেক্ষিক। একেক জনের কাছে একেকরকম হতে পারে। কারো কাছে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তিই সাফল্য, কারো কাছে বেঁচে থাকাটাই সাফল্য। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যদি ছোট্ট একটা বাসা বানিয়ে গ্রামে থাকতে পারতাম, সেখানেই কাজ করছি... খাচ্ছি... মন্দ হতো না হয়তো!’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানালেন, আরও কিছুটা বড় পরিসরে আসার ইচ্ছে আছে তার। ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন তিনি। নিজের ব্যানারেই কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে তার। মাঝে বাইরে থেকে ফ্যাশন নিয়ে আরো একটু জেনে আসতে চান তিনি। আর বাবাকে হারানোর পরই অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, এখন কিছুতেই আর আটকে থাকবেন না, এই প্রত্যয় তার। ব্যক্তিজীবনে শতভাগ সফল এই প্রজন্মের একজন বিদ্যা অমৃত খান আজ সফল ব্যবসায়ী। তিনি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, কাজের সুযোগ পেলে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি আমাদের নারী সমাজের কাছে এক অনুপ্রেরণীয় নারী উদ্যোক্তা। বাংলাদেশে তার মতো যত বেশি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে, বাংলাদেশ তত দ্রুত দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত হতে পারবে।