প্রজন্মের প্রত্নতাত্ত্বিক...

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ১৯:৫২
বাংলা প্রত্নতত্ত্ব শব্দটি ‘প্রত্নপ’ ও ‘তত্ত্ব’ ধাতু দুটির সমন্বয়, যার অর্থ পুরাতন বিষয়ক জ্ঞান। প্রচলিত ধারণায়, বস্তুগত নিদর্শনের ভিত্তিতে অতীত পুনঃনির্মাণ করার বিজ্ঞানকেই প্রত্নতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করা হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদের কাজ হলো বিষয়কে বিশ্লেষণ করে প্রাচীনকালের মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির তত্কালীন চিত্র বোঝা এবং তার মাধ্যমে মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের মানুষ এবং পরিবেশের রূপরেখা নির্মাণ করা। তেমনই কয়েকজন প্রত্নত্ত্ববিদদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন, পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। সম্পাদনা এবং গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র বু ল বু ল আ হ মে দ সহকারী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বুলবুল আহমেদ ডাক নাম :বুলবুল জন্মতারখি ও স্থান :১৯ আগস্ট ১৯৭৪, মেহেরপুর মায়ের নাম :সালেহা খাতুন বাবার নাম :মোহা. আজিজুল হক প্রথম স্কুল :শালিখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেহেরপুর প্রিয় মানুষ :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রিয় উক্তি :রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে, বিশেষ করে ছেলে সাত্ত্বিকের সাথে খেলে। সাফল্যের সংজ্ঞা :সততার সাথে পরিশ্রম। ১৯৯৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন বুলবুল আহমেদ। তবে কৈশোর থেকেই দানিকেন, রাকিব হাসানের লেখালেখি পড়ে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ের উপর প্রচুর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তার এখনও মনে পড়ে স্কুলের বন্ধুরা মিলে সাইকেলে চেপে মেহেরপুরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, যেমন, আমঝুপি নীলকুঠী মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ঘুরতে যেতেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তির প্রস্তুতি হিসেবে পরীক্ষার পূর্বেই ঢাকার বিভিন্ন জাদুঘর ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রসমূহ দেখে বইয়ের বর্ণনার সাথে তাদের মেলাতেন। পুরাতন জিনিসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার তখন থেকেই। বুলবুল আহমেদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মেহেরপুরে। কৈশোরের বন্ধু আলমগীর, নূরুজ্জামান, ইকবাল, মফিজুর, ফজলু, আসাদ, কার্জন, রণ—সবার সাথে আড্ডাই কাটত অনেক সময়। কর্মজীবনে সবাই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো খুঁজে ফেরেন সেইসব দিনগুলো। বাবা-মা ও তিন বোন সবাই থাকে মেহেরপুরে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, মা গৃহিণী, বোনরা সকলে শিক্ষা পেশায় নিযুক্ত। জীবনসঙ্গী রিদিতা ও ছেলে সাত্ত্বিক নিয়ে তিনি ঢাকায় থাকেন। রিদিতা পেশায় শিক্ষক, বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছে। তার কাজ সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা করছি। পড়াই প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রাতত্ত্ব, প্রত্নসামগ্রীর সংরক্ষণ ও প্রত্নক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কোর্সসমূহ। আরও নিয়োজিত আছি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নির্মিতব্য টাকা জাদুঘরের কর্মকাণ্ডের সাথে। সম্প্রতি শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির আদি রং নির্ণয় কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। এ-ছাড়া ২০১২-১৩-এ অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের গবেষণা সহকারী হিসেবে শেষ করলাম ইউনেস্কো ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালনায় পাহাড়পুর বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্রের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণা কর্ম।’ গত ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে নলিনী কান্ত ভট্টশালীর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সেমিনারে ‘বাংলাদেশে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত মুদ্রা :একটি পর্যালোচনা’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। তার প্রকাশনার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘The Mahasthan Hoard II of Silver Punch-Marked Coins’. ছাপাঙ্কিত মুদ্রার উপর গবেষণা করে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন ২০০৮ সালে। বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার ১৫টি প্রবন্ধ। আর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬টি। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন ইট নির্মিত প্রত্নতাত্ত্বিক ইমারতের সংরক্ষণ বিষয়ে। নতুনদের কাজ সর্ম্পকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুনরা যারা পেশা হিসাবে প্রত্নতত্ত্বকে গ্রহণ করার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে তারা বেশ ভালো করছে। এ প্রসঙ্গে আমি আমার নবীন সহকর্মী মিজানুর রহমান, সাবিকুন নাহারের নাম উল্লেখ করতে চাই। তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় আরও অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী পেশা হিসেবে প্রত্নতত্ত্বকে গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে তারা অন্য পেশাতে নিয়োজিত হচ্ছে। পরামর্শ দেওয়া আমার পছন্দের নয়। শুধু একটিই আশা তারা যেন সকল ক্ষেত্রে সত্ থাকে। কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হলে নিজেকে প্রশ্ন করে যেন সমাধান পেতে সচেষ্ট হয়।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বকে শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেন ছোট থেকেই দেশ, দেশের আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করে তারা বেড়ে ওঠে। এ লক্ষ্যে ঐতিহ্য-শিক্ষা ও তার প্রসার নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। রা খী রা য় উপ-পরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাখী রায় ডাক নাম :পিউ জন্মতারিখ :২২ আগস্ট মায়ের নাম :বন্দনা পোদ্দার বাবার নাম :রাম নারায়ণ রায় প্রথম স্কুল :৪নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদপুর প্রিয় মানুষ :আমার সহজ সরল মা, যিনি নিজের জন্য কখনও ভাবেন না। প্রিয় উক্তি :সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। প্রিয় পোশাক :শাড়ি সাফল্যের সংজ্ঞা :যে অবস্থানেই কাজ করি না কেন তার গভীরে পৌঁছাতে সমর্থ হওয়া, পরস্পরকে সহযোগিতা প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে ফলাফল সঠিকভাবে উপস্থাপন করা। চাঁদপুর শহরে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন রাখী রায়। পরিচিত জনদের কাছে যিনি পিউ নামেই বেশি পরিচিত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে তার ভর্তির বিষয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সৈয়দ কামরুল আহসান টিটু। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়টিকে আত্মীকরণের মধ্য দিয়ে পড়াশোনার ধাপসমূহ ডিঙিয়ে যেতে তিনি তার বিভাগীয় সকল শিক্ষকের নিকট কৃতজ্ঞ। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনার মাধ্যমেই প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হন। তার বাবা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং মা শিক্ষিকা ছিলেন। তার ভাই রূপক রায় চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রভাষক। চার সদস্যের পরিবারে পিউ বড় হয়েছেন শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে। মাতৃপীঠ সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও চাঁদপুর সরকারি কলেজ হতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেবেলা হতেই বাবা-মা’র উত্সাহে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মা-বাবা তাকে শিখিয়েছেন, খুব সহজভাবে নিজের নীতি বিসর্জন না দিয়ে যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় শুধুমাত্র মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। তার স্বামী বিষ্ণু রায় বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ও দুই সন্তান (পূর্ণ অর্চিত, রূপকথা বুনন), শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে তার একান্নবর্তী পরিবার। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে পিউ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে মাস্টার্স সম্পন্ন করে কিছুদিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, CODA কলেজ এবং তারপরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগদান করি। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি তার প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগদানের ফলে। সোনারগাঁও উপজেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জরিপ, কুমিল্লা ময়নামতিতে উত্খননসহ দেশ-বিদেশে (ভারত, দ. কোরিয়া) বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি। চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে কর্মরত থাকা অবস্থায় মুরং, চাকসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জীবনাচরণ ও হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যকলা বিষয়ে গবেষণা করেছি। বর্তমানে আমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রত্ন.) হিসেবে চলতি দায়িত্ব পালন করছি এবং Origin of Stone Artifact বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছি।’ নিজের পেশা নিয়ে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব হলো নিজের, জাতির সভ্যতার উেসর সন্ধান করা। বাংলাদেশের সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সম্বলিত নিদর্শনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে কাজ করতে পেরে আমি ঈশ্বরের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। সহকর্মীদের সহযোগিতা, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ বিশেষ করে আমাদের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কাজের পরিবেশ খুবই স্বাচ্ছন্দ্যময়। এ ছাড়া প্রায়ই আমাদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয়। প্রত্ন এলাকার পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনসাধারণের, প্রশাসনের সচেতনতা ও সার্বিক সহযোগিতা কাজের গতিকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে।’ নতুনদের কাজের মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘নবীনরাই ইতিহাসকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। পৃথিবীব্যাপী আবিষ্কৃত নতুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসমূহ নবীনরা প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় প্রয়োগ করে থাকে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে। তারা উত্খনন ও অন্যান্য গবেষণা কাজে প্রচুর পরিশ্রম করে তাদের বহুমাত্রিক চিন্তাধারা প্রত্নতত্ত্বকে সকল জনগণের নিকট উপস্থাপনে সহায়তা করে থাকে’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন তার সন্তানরাসহ পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটি সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতিমুক্ত বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো একটি স্বদেশ পায়। নূ রু ল ক বি র র নি সহকারী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নুরুল কবির ডাকনাম :রনি জন্মতারিখ ও স্থান :১৪ জুলাই, ঢাকা মায়ের নাম :হোসনে আরা বেগম বাবার নাম :মো. নাজিম উদ্দিন ভুইয়া প্রথম স্কুল :পারিজাত শিক্ষাঙ্গন প্রিয় মানুষ :রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয় উক্তি :বি অ্যান এক্সামপল। প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্যে পৌঁছানো। লালবাগ কেল্লার পাশেই বেড়ে ওঠা। ছোট্ট একটা ছেলে প্রতিদিন হাঁটে সেই রাস্তায়, বিরাট দেওয়ালের মাঝ দিয়ে দেখার চেষ্টা করে কী করে অনেক অনেক বছর আগে এই দালানকোঠা বানানো হলো? কে বানাল? কেনই বা বানাল? কী আছে এর মাঝে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে ফিরত যে ছেলেটি, সে তখনও জানে না মনে মনে প্রত্নতত্ত্বের প্রতি দারুণ আকর্ষণ জন্মে গেছে তার। তিনি নূরুল কবির রনি, এনকে রনি নামেই অধিক সমাদৃত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তিনি। ছেলেবেলায় যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে ফিরেছিলেন, আজও সেই নেশায় পথচলা তার। প্রথমদিকে রনির মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষিতে এটিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো সুযোগ হয়তো অতটা নেই, কাজ করতে এসে দেখেছেন আদৌ তেমনটা নয়। আমাদের দেশেও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ আর ক্ষেত্র রয়েছে। এগুলোকে শুধু আরও একটু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সরকারকেও আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানালেন তিনি। সরকারি দপ্তরে আরও কাজের সুযোগ বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। নতুনদের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রনি বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব বিভাগটা আমাদের দেশে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। সেই দিক বিবেচনায় শিক্ষকরাও নতুন। এই জন্যই নবীন একটা দল নিয়ে তারা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ভালো দিক রয়েছে অনেক, পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার কোনো বিকল্প নেই। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে সেই মাত্রায় গবেষণা না হওয়াতে অনেক সমস্যা রয়েছে, আমাদের উচিত সমস্যা আর সম্ভাবনার দূরত্ব কমিয়ে আনা। সে লক্ষ্যেই কাজ করছেন আমরা। আর সে দিক দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা শতভাগ, নিজের দেশের প্রতি আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়েই ইতিহাস সন্ধানে নামি আমরা। কতই না প্রাচীন তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ হয় আমাদের! আনন্দের জায়গা থেকে দেখলেও এটা বা কম কী? নূরুল কবির রনি স্নাতক শেষ করেই বাংলাদেশের উপনিবেশ সময়কালের ঐতিহাসিক স্থাপত্য যেমন সেই আমলের জমিদার বাড়ি, গির্জা নিয়ে গবেষণার জন্য এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময়ের স্থাপত্যরীতি, সাংস্কৃতিক পটপরিবর্তন, আবর্তন অনেক কিছু সম্পর্কেই জানার সুযোগ হয়েছিল তখন। আর সে যাত্রায় এবার তিনি ঔপনিবেশিক সময়ের স্থাপত্যের নগর পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন। এর মাধ্যমে হয়তো অনেক পুরোনো বিষয় জানতে পারব আমরা।’ নুরুল কবির রনি ব্যক্তিজীবনে অনেক সুখী একজন মানুষ। পুরোনো ঢাকায় তার বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত দিনগুলো কেটেছে তার মাঝেই। বাবা পুরোনো ঢাকারই সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী, মা একজন গৃহিণী। রনির স্ত্রী কাজী আফরিন জাহানও প্রত্নতত্ত্ববিদ। কাজ করছেন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান আরাফ কবির, তাকে নিয়েই কেটে যায় তাদের সুখের সময়। ভবিষ্যতেও এই প্রত্নতত্ত্ব নিয়েই কাজ করে যেতে চান রনি। অনেক অজানা দিক বেরিয়ে আসবে তার হাত ধরে, সমৃদ্ধ হবে আমাদের প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক দিকগুলো। তেমনটাই চাওয়া এই প্রজন্মের। সো হ রা ব উ দ্দী ন অতিরিক্ত পরিচালক ঐতিহ্য অন্বেষণ মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন ডাকনাম :সৌরভ জন্মতারিখ :২৫ আগস্ট, কল্যাণপুর, ঢাকা মায়ের নাম :সুরাইয়া বেগম পিতার নাম :মরহুম এবি মোছলেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম স্কুল :সরকারি আইডিয়াল স্কুল, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। প্রিয় মানুষ :আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। প্রিয় উক্তি :কখনও মনকে ধোঁকা দিও না, কারণ সে তোমার সবচেয়ে আপনজন। প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, ফতুয়া, জিন্স অবসর কাটে :ফটোগ্রাফি, বাগান করা, মেয়ের সাথে খেলা। সাফল্যের সংজ্ঞা :মনের গহীনের সত্-সুন্দর আনন্দময় ইচ্ছাগুলোর সফল বাস্তবায়ন। পেশাদার জীবনের শুরুটা ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) থেকে ১৯৯৭ সালে যখন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বের হন তখন খেলাটাই জীবনের সব। খেলতেন ঢাকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এমন সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক সিনিয়র বন্ধু এসে বললেন, প্রত্নতত্ত্বে পড়বেন কি না? বিভাগ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভালো গোলকিপার প্রয়োজন। সেই প্রথম প্রত্নতত্ত্বের নাম শোনা। বিষয়টা বন্ধু যেভাবে বোঝালো তাতে বুঝলেন প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা। ছোটবেলা থেকেই খেলার পাশাপাশি আর্ট ক্রাফটসের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। তাই মনের ভিতর থেকেই সম্মতি এলো, ভর্তি হয়ে গেলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীনের শুরুর গল্পটা এমনই। মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন পরিবারের ৬ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ার কারণে খুব বেশি বিধি-নিষেধ তার উপর আরোপ হয়নি। কিন্তু বাড়িতে না বলে ফুটবল খেলতে গিয়ে কত মার যে জীবনে খেতে হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। তারপর বিকেএসপি’তে ভর্তি হতে পেরে যেন স্বর্গ হাতে পেলেন। তবে বাবা শর্তজুড়ে দিলেন যদি পড়াশোনায় খারাপ করেন তবে ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। সেই থেকে তার খেলার পাশাপাশি পড়াশোনায় ভালো হয়ে ওঠা। জাতীয় পর্যায়ে অনুর্ধ্ব ১৪ ফুটবল খেলেছেন। তারপর পরিণত বয়সে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, শান্তিনগর, অগ্রণী ব্যাংকের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ আর প্রথম বিভাগে খেলা। বিতর্কের প্রতি আগ্রহ ছিল, স্কুল ও কলেজে থাকতে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যেই অনেকটা নাটকীয়ভাবে অর্নাসে প্রথম শ্রেণীতে ২য় হয়ে গেলেন। মাস্টার্স পরীক্ষার সময় বিসিএস লিখিত পরীক্ষা শুরু হলে বাবা বললেন, দুটোর প্রস্তুতি একসাথে নিলে কী হবে? তিনি বললেন, জানি না। বাবা বললেন, আর যদি বিসিএস ছেড়ে দিস? তিনি বললেন, ইনশাল্লাহ প্রথম। সত্যি সত্যি বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছেন তিনি। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাননি। নেশা-পেশা এখন একটাই প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, ‘২০০০ সালে দূর্গ-নগর উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান স্যারের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় গিয়ে এ কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা জানাই। স্যার সম্মতি দিলে শুরু হয় আমার প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে বাস্তব কাজের হাতেখড়ি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এক যুগেরও অধিক সময় জুড়ে প্রতিবছর প্রত্নতাত্ত্বিক খননে অংশগ্রহণ করছি। পাশাপাশি ২০১১ সাল থেকে প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন সমৃদ্ধ মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের রঘুরামপুর অঞ্চলেও চলছে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উত্খনন ভিত্তিক মাঠ পর্যায়ের সমষ্টিক গবেষণা ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির শিল্প নিয়ে কাজ করছি। এই বিষয়ে ইতিহাস একাডেমী থেকে সোমপুর মহাবিহারের পোড়ামাটির ফলকে জীব-বৈচিত্র্য শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্প বিষয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পিএইচডি গবেষণা করছি প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির ফলকচিত্র নিয়ে। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য অন্বেষণ-এর অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ডে স্থাপত্য, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্সটি পড়াই।’ মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীনের ভবিষ্যত্ একটা ওয়েবসাইট তৈরির যেখানে একই সাথে থাকবে বাংলাদেশের সব প্রাকৃতিক আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান, স্থাপনা আর নিদর্শনের ছবি। গত কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় আজ তা আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।