অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে থাকল গল টেস্ট। পুরনো রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড গড়ার সাক্ষী হলো, সাক্ষী হলো শ্রীলংকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস রচনার। তাছাড়া তৃতীয় দিন শেষে অপরাজিত থাকা দুই ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আশরাফুল ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের ব্যক্তিগত রেকর্ড, যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপ রেকর্ড, ৫৭০ রান পেছনে থেকে ফলো অন এড়ানো—এতকিছুর সাক্ষী যখন এই টেস্ট, তখন তো শ্রীলংকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ‘ভালো কিছু’র স্বপ্ন দেখতেই পারে। ৫৭০ রানের পাহাড়ের নিচে বাংলাদেশকে চাপা দিয়ে হয়তো সহজেই জয়ের স্বপ্ন দেখছিল লংকানরা; কিন্তু তাদের স্বপ্নের সামনে দুর্ভেদ্য ‘প্রাচীর’ হয়ে দাঁড়ালেন আশরাফুল ও মুশফিকুর। এখন লংকানদের চোখের স্বপ্ন যেন ‘ছিনতাই হয়ে’ বাংলাদেশিদের চোখে!
লংকানদের ৫৭০ রানের জবাবে গতকাল তৃতীয় দিনশেষে বাংলাদেশ ৪ উইকেটে ৪৩৮। মাত্র ১৩২ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা। এতকিছু অর্জনের এই দিনে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে আশরাফুল ও মুশফিকুরের ব্যক্তিগত অর্জন। ভারতের বিরুদ্ধে ১৫৮ রান এতদিন সর্বোচ্চ ছিল আশরাফুলের। কাল সেটি ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ১৮৯ রান, সেটাও অপরাজিত। মাত্র ১১ রান করলেই গড়বেন আরো একটি রেকর্ড। স্পর্শ করবেন ডাবল সেঞ্চুরি; যে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে এটিই হবে প্রথম। তার সাথে ২৬১ রানের পার্টনারশীপ গড়া মুশফিকও দেড়শ রান ছুঁয়ে ফেলেছেন। তার আগের সর্বোচ্চ রান ছিল ভারতের বিরুদ্ধে ১০১ (২০১০ সালে)। তিনিও যদি ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলেন অবাক হবার কিছু থাকবে না।
ভারতের বিপক্ষে ২০১০ সালে তামিম ইকবাল ও জুনায়েদ সিদ্দিকির ২০০ রানের পার্টনারশীপের রেকর্ডটি কাল ভেঙ্গেছেন আশরাফুল ও মুশফিক। টানা পাঁচ ঘণ্টা ব্যাটিংয়ের ফসল হিসেবে এসেছে নতুন এই রেকর্ড। দিনের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে হাফ সেঞ্চুরিয়ান মোমিনুল হক ও সহ-অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের বিদায়ে বাংলাদেশের স্কোর বোর্ড পরিণত হয় ৪ উইকেটে ১৭৭ রান। হাফ সেঞ্চুরি করে যখন মোমিনুল ফিরে যান তখনো সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে পারেননি আশরাফুল। লাঞ্চের কিছুক্ষণ আগে ক্যারিয়ারের পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন বাংলাদেশের লিটল মাস্টার নামে পরিচিত এই ব্যাটসম্যান। যিনি মাত্র কদিন আগে নির্বাচকদের বিবেচনার আড়ালেই ছিলেন। সাম্প্রতিক ফর্মও তাকে আকরাম খানের নির্বাচক কমিটির মন গলাতে পারেনি। অবশেষে হাতের তালু ফেটে যাওয়ায় শাহরিয়ার নাফীসের পরিবর্তে দলে ঠাঁই পান আশরাফুল। এক রকম বাধ্য হয়েই নির্বাচকরা তাকে দলে নিয়েছে। নাফীসের ইনজুরি তো রয়েছে।
দলে অভিজ্ঞ কেউ না থাকায় শেষ পর্যন্ত আশরাফুলকে স্কোয়াডে নিয়েছে নির্বাচক কমিটি। প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে এ বছরেই তার দুইটি সেঞ্চুরি রয়েছে। এরপর কাল করলেন আরো একটি; যেটি তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এর মধ্যে পাঁচটিই শ্রীলংকার বিরুদ্ধে।
শূন্য রানে রিয়াদের বিদায়ের পর মুশফিকের সাথে জুটি গড়তে গিয়ে একটু সাবধানেই ব্যাট চালিয়েছেন আশরাফুল। নব্বই থেকে একশতে পৌঁছাতে তার লেগেছে ৩৫টি বল। তবে ১৫২ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিক ১০৩ রানে দিলশানের কাছ থেকে পেয়েছেন লাইফ। রিটার্ন ক্যাচ ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন শ্রীলংকান এই অলরাউন্ডার।
গত বছর নভেম্বরে দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৫৫৬ রানের পর গল টেস্টেও বাংলাদেশের সামনে উঁকি দিচ্ছে পাঁচশ রানের ইনিংসের সম্ভাবনা। আজ হয়তো সেটি ছুঁয়ে ফেলবে সফরকারীরা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সঙ্গে থাকতে পারে দুইটি ডাবল সেঞ্চুরিও!
এক নজরে --------------
++আশরাফুলের ১৮৯ রানের অপরাজিত ইনিংসটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস।
++মুশফিকুরের অপরাজিত ১৫২ রানের ইনিংসটি দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস।
++আর ৬ রান করলেই মুশফিক উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ ইনিংসটির মালিক হবেন
++এই প্রথম বাংলাদেশের দু জন ব্যাটসম্যান একই ইনিংসে ১৫০ রান পার করলেন।
++ক্রিস গেইলের ৩৩৩ ও বীরেন্দর শেবাগের ২০১ রানের পর আশরাফুল হলেন শ্রীলঙ্কার মাটিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস খেলা সফরকারী ব্যাটসম্যান। পৃষ্ঠা ১৯ কলাম ৭++বলের বিবেচনায় আশরাফুলের ৩৮১ বলের এই ইনিংস বাংলাদেশের দীর্ঘতম ইনিংস।
++পঞ্চম উইকেটে আশরাফুল-মুশফিকের ২৬১ রান বাংলাদেশের যে কোনো উইকেটের জন্য সর্বোচ্চ।
++শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটিও এই ২৬১ রান।
++শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস এই ৪ উইকেটে ৪১৩ রান।
++বিদেশের মাটিতে এই ৪ উইকেটে ৪১৩ রানই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।
++১০০ বা তার বেশি ওভার ব্যাট করে এতো কম উইকেট এর আগে কখনো হারায়নি বাংলাদেশ।
++শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো সে দেশে একটি টেস্টে ৫ জন বা তার বেশি ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করলেন
