নিয়োগ বিধি জটিলতায় প্রায় তিন মাস ধরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের একশ’র মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসির অর্গানোগ্রামে ত্রুটি ও কোন নিয়োগ বিধি না থাকলেও বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু তিন মাস আগে হঠাত্ করে মহাহিসাব রক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিএন্ডএজি) আপত্তির কারণে তাদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। বেতন বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্থকষ্টে পড়ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, বেতন বন্ধ রাখার কোন কারণ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতোদিন ধরে বেতন পেয়ে আসছে। তবে নিয়োগবিধি জটিলতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দ্রুত নতুন নিয়োগ বিধি তৈরির কাজ চলছে। বিষয়টি সিএন্ডএজি অফিসকে জানানো হয়েছে। আশা করছি তাদের বেতন পেতে আর কোন সমস্যা হবে না।
নিয়োগ বিধি নিয়ে যে জটিলতা
১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে সেই বিধিমালা বাতিল করে আরেক নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই বিধি ১৯৭৯ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশ গেজেটের প্রথম খন্ডে প্রকাশ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ গেজেটের প্রথম খন্ডে আইনের ভিত্তিতে প্রণীত বিধিমালা ও আদেশাবলী প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ‘ইসি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিধিমালা-২০০৮’ বাংলাদেশ গেজেটের ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়। সেই বিধিমালা একই সময়ের গেজেটের প্রথম খন্ডে প্রকাশ না করে বিগত কমিশন অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করেছিল। আর ইসি সচিবালয় আইন, ২০০৯ জারি করা হয় তার এক মাস ১৩ দিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ। একই সময়ে প্রণীত খসড়া দু’টিতে পরস্পর বিরোধী ছিল। যার কারণে আইনত ইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কোন বিধিমালা নেই। এর কারণ হলো-নির্বাচন কমিশনের ২০০৮ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা জারি করে ১৯৭৯ সালের বিধিমালা রহিত করে। তারপর ইসি সচিবালয় আইন ২০০৯ জারি করা হয়। সেই আইনের ৯ নং ধারায় বিধান করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ বিধিমালা দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিযুক্ত হবেন ঃ তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত ’৭৯ সালের বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
এর ফলে ২০০৮ সালের বিধিমালা আইনত অনুসরণ যোগ্য নয়। অথচ ’৭৯ সালের এবং ২০০৮ সালের উভয় বিধিমালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসি সচিবালয় আইন, ২০০৯ জারির মুহূর্ত থেকে গত চার বছর ধরে ইসিতে কর্মরত-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন নিয়োগ বিধিমালা নেই। কমিশনে প্রকৃতপক্ষে কোন বৈধ বিধিমালা না থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালে বিগত কমিশন তাদের আস্থাভাজন ৫৭ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছিল। যা আইনত তখনও বৈধ ছিল না, এখনো বৈধ নয়। ইসি সচিবালয় আইন, ২০০৯ মোতাবেক ওই আইন জারির তারিখ থেকে এ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারিগণের জন্য কোন বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় কমিশন এ ব্যাপারে বিধিশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
নিয়োগ বিধির জন্য ৫ সদস্যের কমিটি
গত বছরে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালার খসড়া করার জন্য অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটিতে আছেন যুগ্ম সচিব-এন আই খান, বিশ্বাস লুত্ফুর রহমান, জেসমিন টুলি। সদস্য সচিব হয়েছেন-উপ-সচিব মতিয়ার রহমান। এই কমিটি নিয়োগ প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানা গেছে।
জটিলতা নিরসনে জরুরি বৈঠক
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত করতে গতকালই ইসি সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলির সভাপতিত্বে সিএন্ডএজি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নতুন নিয়োগ বিধি করার শর্তে সিএন্ডএজির আপত্তি প্রত্যাহার করার ব্যাপারে ইতিবাচক হয়েছে। এ বিষয়ে জেসমিন টুলি ইত্তেফাককে বলেন, দু’-একদিনের মধ্যে যারা বেতন পাচ্ছেন না তারা পেয়ে যাবেন।
