শচীন কর্তার বাড়িতে

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ১৮:১২

মির্জা আবু হেনা কায়সার টিপু

 

‘শোন গো দখিন হাওয়া প্রেম করেছি আমি’—এস ডি বর্মণের কণ্ঠে সেই প্রখ্যাত গান। বলছিলাম, উপমহাদেশের সঙ্গীতের রাজপুত্র কুমার শচীন দেব বর্মণের কথা। তিনি ছিলেন ত্রিপুরা রাজের রাজপুত্র। বাংলা ও হিন্দি গানের সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে বিশ্বখ্যাত এই সঙ্গীত প্রতিভার জন্ম আমার জন্ম জেলা কুমিল্লা শহরে। মনে আছে আমি যখন কুমিল্লায় ছিলাম শচীনদার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িটির কাছে ছুটে যেতাম প্রায়ই। আমার জন্ম বুড়িচংয়ের শিবরামপুর। কুমিল্লা জেলার একটি সবুজ শ্যামল গ্রাম। কুমিল্লা শহরটি আমার গ্রাম থেকে ১২ কিলোমিটারের পথ। কুমিল্লা শহরেই কেটেছে আমার জীবনের অনেকটা সময়। আমিতো প্রায়ই পায়ে হেঁটে চলে যেতাম আমার মফস্বল শহরের আঙিনায়। শহরের কোনো প্রান্তই আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে ছিল না। থাকতাম গ্রামেই। ছুটে যেতাম প্রিয় শহরের বুকে, ফিরতাম রাতে। জীর্ণশীর্ণ দাঁড়িয়ে থাকা শচীন কর্তার বাড়িটি আমার ভীষণ প্রিয়। বাড়িটির সামনে গেলেই মনে হয়—শচীন কর্তা এই বুঝি গেয়ে উঠবেন সেই বিখ্যাত গানটি, ‘তুই কী শ্যামের বংশী রে।’

কুমার শচীন দেব বর্মণ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন কুমিল্লা শহরে (তত্কালীন কুমিল্লা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত)। শচীন দেব বর্মণ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজপুত্র হলেও তিনি মিশতেন সাধারণের সাথে। অখণ্ড ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের খুবই জনপ্রিয় শহর ছিল এই কুমিল্লা। রাজরাজেরা এই শহরকেই বেছে নিয়েছিলেন বসবাসের জন্য। একজন অসাধারণ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে শচীনদার গায়কীতে ছিল ভিন্নমাত্রা। বাংলা গান তথা ভাওয়াইয়া সুরের দরদ নিয়ে উপস্থাপনে তার সমকক্ষ বিরল। সঙ্গীতের অসামান্য অবদান তাঁকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালি হূদয়ে। শচীন দেব বর্মণ পরবর্তীতে এস ডি বর্মণ নামে পরিচিত হন। কলকাতা শহুরে জীবনের হিসেব-নিকেশের চূড়ান্ত অধ্যায় রচনা করে ফেলেন এই মহাগুণী। বাংলা গানকে অনন্য উচ্চতায় নিতে কলকাতা তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি রচনা করে দেয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গান এই ছিল শচীন কর্তার জীবনের মানে। বোম্বে শহরেই সঙ্গীতের শীর্ষস্থান দখল    করেন হিন্দি জনপ্রিয় সব সিনেমার জন্য গান গেয়ে, সুর করে ও সঙ্গীত পরিচালনা করে। এই মহান মানুষটি যদিও শৈশবে আগরতলা শহরের একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে তা ভর্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি ভর্তি হন কুমিল্লা শহরের ইউসুফ স্কুলে। তারপর পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন কুমিল্লা জিলা স্কুলে। ১৯২০ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্টিক পাশ করেন। ১৪ বছর বয়সে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন ও ১৯২২ সালে এই কলেজ থেকে আইএ ও ১৯২৪ সালে বিএ পাশ করেন। কুমিল্লা শহর শচীন কর্তার অস্তিত্বজুড়ে ছিল। একটি কথা বলে রাখি, তিনপুরুষের শচীন প্রেম আমার। দাদা হাফিজ উদ্দিন শচীন কর্তার গানের ভক্ত ছিলেন শুনেছি। বাবা আবদুল মজিদ শচীনদার গানের পাগল প্রেমিক। বাবা ভালো গানও  করতেন। আম্মা জাহানারা বেগম ছিলেন শচীন কর্তার গানের একজন মুগ্ধ শ্রোতা। আমি, আমার তো শচীনদার গান ছাড়া চলেই না।      শচীনদার বাড়িটি  আমাকে এখনো টানে। দারুণ আকর্ষণ এই বাড়িটির প্রতি আমার । উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত মানুষটি ৬৯ বছর বয়সে ৩১ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে বোম্বেতেই পরলোকগমন করেন। তাঁর জন্য কুমিল্লার বাড়িটি কাঁদে, কাঁদে শহর কুমিল্লা, কাঁদে আমারও মন। সময় পেলেই ছুটে যেতে মন চায় পৈতৃক নিবাস মজিদ কুঠিরে, আর শচীন কর্তার ঘরে। এরই ভেতর যে আমার আমি লুকিয়ে।