১৫৮তম রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সানিডেইলের আয়োজন

ক্ষুদে শিল্পীদের জাদুকরী পরিবেশনা

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ১৮:১৩

তানভীর তারেক

 

ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো নিয়ে হরহামেশা বিভিন্ন গণমাধ্যম সামগ্রিকভাবে নানা ধরনের খবর প্রচার করে থাকে। তাতে একটি কমন অভিযোগ থাকে যে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো বাংলা সংস্কৃতিকে নাকি ধারণ করে না। কিন্তু নগরের সানিডেইল স্কুল যেন অনেকের ভেতরে ভিন্নপথে হাঁটা বিদ্যাপীঠ। মাত্র ৬/৭ বছরের ক্ষুদে শিল্পীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ও গীতিনাট্যের দারুণ কিছু বিষয় উপস্থাপন করালো তারা।

 

জাদুঘর মিলনায়তনে ক্ষুদে পারফর্মার আর বুড়ো দর্শক

সাধারণত জাদুঘর মিলনায়তনের মতো এমন ভেন্যুতে শিশুদের ঢোকার ক্ষেত্রে আলাদা বিধি-নিষেধ রাখা হয়। কিন্তু সানিডেইল স্কুলের এই অনুষ্ঠানে দৃশ্যপট উল্টো। কারণ এখানে মূল পারফর্মারদের বয়স ৬/৭ বছর। আর দর্শকরা বুড়ো অর্থাত্ শিল্পীদের বাবা-মা, দাদা-দাদিরা। তাই বয়সী দর্শকসহ প্রতিযোগীদের বাবা-মায়ের জন্য বরং গেটে বিধি-নিষেধ বলে দেওয়া হচ্ছে—‘প্লিজ, মোবাইল ফোনটি বন্ধ রাখুন।’

 

আমি নায়কের মা

অনুষ্ঠানের দুটি দিন মিলনায়তনের সামনের দুটি সারি আমন্ত্রিত অতিথি ব্যক্তিত্বদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এর ভেতরে এক মহিলা তার ছোট এক বাচ্চাকে নিয়ে বসে পড়লেন। ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক তাকে পরের সারিতে বসার জন্য অনুরোধ জানালে তিনি বেশ গর্বিত স্মরেই বলেন, ‘আমি নায়কের মা, আমি এখানেই বসবো। আমার ছেলে এই নাটকে অভিনয় করছে।’ পরে গর্বিত মাকে তার পরিবারসহ পছন্দমতো আসনেই বসতে দেওয়া হয়।

 

দু-দিনব্যাপী জমকালো আয়োজন

২৯ ও ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে মঞ্চায়িত হয় পরপর দু-দিনের শো। শুরুতেই আব্দুল্লাহ আল মামুনের নান্দনিক মঞ্চে স্পটলাইটে ক্ষুদে শিল্পী মাইশা মাইনুর সবাইকে স্বাগত জানালেন। শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল যেন বড় কোনো নাট্যদলের প্রদর্শনী দেখছি। সারিবদ্ধভাবে বসা ছাত্রছাত্রীদের সমবেত সঙ্গীত তাসের দেশ থেকে এর খরবায়ু বয় বেগে, এলেম নতুন দেশে, যাবোই আমি যাবোই... ক্রমান্বয়ে যখন লাইভ মিউজিকের সাথে পরিবেশিত হচ্ছিল, তা দেখে যে কেউ চোখ বুঁজে শুনলে বোঝার উপায় নেই যে, শিল্পীদের বয়স মাত্র ৬ বছর। এর মাঝে মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনায় মুদ্রার তেমন কোনো ভুল হলো না। একের পর এক চললো পরিবেশনা। তাসের দেশ, ফাল্গুনী’র পরিবেশনায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব বয়সী দর্শকরা মুহুর্মুহু করতালি দেয়। অতঃপর অচলায়তনের সংলাপ যখন আওড়াচ্ছিলেন ক্ষুদে অভিনয়শিল্পীরা একদম শুদ্ধ উচ্চারণে, দারুণ সব অভিব্যক্তিতে তখন বিশ্বাস করা মুশকিল হলো যে, এটি কোনো প্রফেশনাল নাট্যদল নয়, ইংরেজি মাধ্যমের সারাক্ষণ ইংরেজি বলা বাচ্চারা! দর্শকরাও যেন বিস্ময় গুনছিলেন ওদের দেখে।

 

আগত অতিথিদের মুগ্ধগীত

প্রথমদিন বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান। তিনি ক্ষুদে পণ্ডিত শিল্পীদের পরিবেশনায় এতটাই অভিভূত যে, মঞ্চে উঠে বেশ দারুণ কিছু কথা বললেন, যা অভিভাবকদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তিনি হয়তো ভুলেই গেলেন এটা ছোটদের মঞ্চ।

দ্বিতীয় দিন ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠান খানিক দেরিতে শুরু হয় প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার বিলম্বের কারণে। কারণ তিনি ঢাকায় নেমেই সরাসরি বিমানবন্দর থেকে চলে আসেন অনুষ্ঠানস্থলে। কিন্তু অনুষ্ঠান পুরোটা দেখে তিনি বলেন, ‘এত দারুণ পরিবেশনা, তবু বিলম্বে শুরু হওয়ার কারণে পুরোটা দেখতে পেলাম!’

এছাড়াও বন্যা বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ তো এত ছোট বাচ্চাদের জন্য এগুলো লেখেননি। তবু এত ক্ষুদে বাচ্চারা এমন দারুণ করে গাইলো, মুগ্ধ বললেও কম বলা হবে। তবে ওরা যেন বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথকে ভুলে না যায়।’

 

হঠাত্ নিখোঁজ আসাদুজ্জমান নূর!

দ্বিতীয়দিন অনুষ্ঠান শেষে যখন আমন্ত্রিত অতিথিদের কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডাকা হয় তখন সামনে দাঁড়ানো অন্যান্য অতিথিদের ফ্রেমে হঠাত্ করেই হারিয়ে যান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নুর। কারণ তিনি পেছনে আড়াল হওয়া ক্ষুদে ছেলেমেয়েদের সাথে খুনসুটিতে ব্যস্ত ছিলেন। নিজেন অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘ওদের পরিবেশনা এক কথায় অসাধারণ। আর আমার কাছে তো ছোট ছোট ভুলগুলো দেখতে আরো ভালো লাগছিল। মনে হলো আরো কিছু ভুল করুক না। এত কঠিন একটা প্লে এভাবে ওরা সংলাপ, গান মুখস্থ করে গাইছে, বলছে যেন এক একজন জাদুকর!

 

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বললেন

‘আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিলাম। কিভাবে ওরা গাইলো, অভিনয় করলো। এমন চর্চা নিয়মিত প্রয়োজন।’ পরে অধ্যক্ষের কাছেই জানা গেল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পরিবারের অনেকেই এই স্কুলের ছাত্রছাত্রী।

দু-দিনব্যাপী এই আয়োজনে পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন স্কুল শিক্ষিকারা। পরে জানা গেল গত ৬ মাস যাবত্ টানা রিহার্সেলেই সম্ভব হয়েছে এই জাদুকরী পরিবেশনা। তৃপ্তি আর মুগ্ধতায় তাই স্কুলের অধ্যক্ষ তাজিন আহমেদ ধন্যবাদ জানালেন পুরো টিমকে। আগত অতিথিসহ দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের সন্তানরা এই স্কুলে পাঠ নিয়েছেন। সে কথাও জানান দিলেন। একইসাথে নিয়মিত এমন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রাখবেন বলেও কথা দিলেন। অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা হলেও স্কুলের চেয়ারম্যান তানভীর আহমেদ খান যখন সানিডেইলকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি তুললেন তখন  অধ্যক্ষ তাজিন আহমেদ না সূচক মাথা নেড়ে বললেন, ‘যেভাবে বাচ্চারা পড়ছে, সেটাই যেন ভালোমতো দায়িত্ব নিয়ে পালন করতে পারি।’

এদিকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় শতাধিক ক্ষুদে শিল্পী সারাদিনের রিহার্সেল আর মঞ্চ পরিবেশনায় যেন ক্লান্ত। যে যার বাবা-মাকে খুঁজছে। এদিকে ক্ষুদে সন্তানদের সফল পরিবেশনায় মুহুর্মুহু করতালিতে যেন পুরো মিলনায়তন তাদের সাফল্য জানান দেয়। মুগ্ধকর এ অনুষ্ঠান শেষ হলো সকলে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। শাহবাগের সন্ধ্যা তখন রাতের বয়সে এসে পৌঁছেছে।

 

কলাকুশলীবৃন্দ

পরিচালনা:স্বাতী সরকার, নৃত্য পরিচালনা:বেবী ইরা বালা, নাট্য নির্দেশনা:মিতুল রহমান, সঙ্গীত সহযোগিতায়:সুমাইয়া ইমাম, নৃত্য সহযোগিতায়:নাজরা রহমান চৌধুরী, সার্বিক তত্ত্বাবধান:জেবুন্নেসা মাহমুদ

নৃত্য পরিবেশনায়:নাসমিয়া হোসেন, ইয়ানা আমিরাহ ভূঁইয়া, আফরা নাওয়ার শিরাজী, ত্রেয়ী রায়েকা শাহান, নাভারা ইসলাম ইয়ানা, আজরিন আনজারা হাকিম, তানাজ আহমেদ, রওশান আয়েশা রশ্নি পুষ্পিতা, সিয়ানা মুসাররাত ইসলাম, নুসাইবা আন-নাফি তানিশা, দানিন ইবনাত, উম্মে সামারা তাসনিম, নূরীন হোসেন নামিহা, আনুশকা নামিরা নাহিয়ান

কণ্ঠ সঙ্গীতে:অমিয় তানভীর আনন্দ, জারতাজ হাসান, আইরা আন্দ্রিয়া, ওয়াফিয়া সাঈদ, মো. ফুরাদ আলম চৌধুরী, মো. মাহিব কবির, উনাইসা নাওয়ার, আয়ুম্মান দাস, এম সারতাজ আরনাফ ভূঁইয়া, মাফরুহা মাহমুদ চৌধুরী, মারসিহা রহমান, শাশ্বতী পাল, আদীবা সেরীন মাহমুদ, নুসাইবা আফিজাহ কাজী, রাফসান হাবীব মওলা, সামিহা মেহেক ফেরদাউস, শেহজাদ ইসলাম, আনুশনা হাজরা, আরাত্রিকা সাহা, আরিশা মুনশাআত, ফারিজা বিনতে সেলিম, মোহাম্মদ আতিব জামান, সাময়া ইসলাম, আদিনা ওয়ানিয়া ইসলাম, ফারিহা হাসান জোয়ারদার, নাদিয়া আফরিন

অভিনয়ে:শায়ান আহমেদ, শ্রেয়ান ওয়াদি, কাজী নাওয়ীদ করিম, ফাইয়াজ মাহভীর হোসাইন, রনজয় দেবনাথ, যায়ান জামান, প্রতিম বিশ্বাস, সায়রা যারীন, তাহরির রুহম খান, তানিশা আয়ানা ইসলাম, আলিশবা উনাইসা জাহিদী ইনায়া, সায়ান্তন, এলিনা রহমান।

যন্ত্রশিল্পী: কী-বোর্ড:ডালিম কুমার বড়ুয়া তবলা:এনামুল হক ওমর, অক্টোপ্যাড:কেশব সরকার, মঞ্চ পরিকল্পনা :আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহযোগিতায়:শামিরা খানম ও সাবিরা সুলতানা, পোশাক পরিকল্পনায়:সাতী সরকার ও লামিয়া নুর, আলোক সরবরাহ:সবুজ, শব্দ:সমীর।