পলাতক সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে!

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৩, ২২:৫২
চলমান রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আত্মগোপনকারী চি?হ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের হরতাল কর্মসূচিসহ শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের হরতাল বিরোধী মিছিল-মিটিংয়ে তাদের সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। এইসব সন্ত্রাসী খুলনা মহানগরীসহ গ্রামাঞ্চলে নিজ নিজ দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যক্তিদের নিকট আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক সময় এরা প্রকাশ্যেই প্রতিপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ইতিমধ্যে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের হামলায় দুই পুলিশ সদস্য নিহত ও সংঘর্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের জেলাগুলোতে সহিংসতা বৃদ্ধির আশংকা করছেন সাধারণ মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৯ মার্চ কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের জামায়াত অধ্যুষিত গোলখালি গ্রামে অভিযান চালায় পুলিশ। তারা প্রথমে গোলখালী গ্রামে গিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতা গণি সরদারকে গ্রেফতার করে। পরে জামায়াতের আরেক নেতা আব্দুর রশিদ সরদারকেও গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতারের খবর পেয়ে এলাকার জামায়াত-শিবির সমর্থকরা মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেয়, ‘পুলিশ আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, আপনারা যে যেখানে আছেন এগিয়ে আসেন।’ এরপর ওই এলাকার শ’ শ’ নারী-পুরুষ গোলখালি গ্রামে সমবেত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ও আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেটসহ ২৫ রাউন্ড শটগানের গুলি ছোঁড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ ও নারী-পুরুষসহ ৮/১০ জন আহত হন। একপর্যায়ে পুলিশের কাছ থেকে গ্রামবাসী জামায়াত নেতা গণি সরদার ও আব্দুর রশিদ সরদারকে ছিনিয়ে নেয়। গ্রামবাসীর হামলায় পুলিশ টিকতে না পেরে পিছু হটলে উত্তেজিত জনতার মধ্য থেকে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। একটি গুলি কনস্টেবল মফিজুর রহমানের (৪৬) বাম পায়ের হাঁটুর কাছে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের গুলিতেই কনস্টেবল মফিজুর রহমান নিহত হয়েছেন। একই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় মাদক সম্রাট হিরু বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তা সার্জেন্ট আশরাফ আলী ও এএসআই জিল্লুর রহমান মাদক ব্যবসায়ীদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম হন। এর আগে গত ৩ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা দুই দিনের হরতালের প্রথম দিনে যুগ্নিপাশা নামক স্থানে খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধকারী জামায়াত-শিবির ও বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় হরতাল সমর্থকরা ফুলতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশীদ, এএসআই জাহিদ, নায়েক কেরামত আলী ও কনস্টেবল সেলিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। সংঘর্ষকালে পুলিশের একটি গ্যাস গান খোয়া যায়। একই দিন ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলা সদরে হরতাল সমর্থকরা কুপিয়ে পুলিশ কনস্টেবল ওমর ফারুককে হত্যা করে। এ সময় ১০ পুলিশসহ অন্তত অর্ধশত আহত হয়। এছাড়া ৩ মার্চ হরতালে সাতক্ষীরায় বিজিবি’র সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন নিহত ও বিজিবি’র ৩ জন সদস্য আহত হন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয় আরও ৮/১০ জন জামায়াত-শিবির কর্মী। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার কোথাও না কোথাও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সংঘর্ষকালে যানবাহন ভাঙচুর, দোকানপাট লুট এমনকি হতাহতের মত দুঃখজনক ঘটনাও ঘটছে। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, চলমান রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে চি?হ্নিত সন্ত্রাসীরা অংশ নেয়ায় সহিংস ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালনরত জাহিদ, সেলিম, সুকুমার ও রাশেদসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আমরা সারাক্ষণই চিন্তায় থাকি, কখন আমাদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা হয়। পেটের দায়ে চাকরি করতে এসে এখন আমাদের জীবন নিয়েই টানাটানি চলছে। আমাদের স্ত্রী-সন্তানরা সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকে কখন জানি কনস্টেবল মফিজুর ও ওমর ফারুকের মত তাদের কাছে আমাদের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায়।’