আমার লেখা-লেখির শুরুটা একটু অন্য রকম, আর পাঁচজন লেখকের মতো নয়, মানে পারিবারিক বলয়ে তৈরি হওয়া, উত্সাহ পাওয়া, পড়াশোনা করে অনুকূল পরিবেশে গড়ে ওঠা— না এসব কোনটাই আমার ভাগ্যে ঘটেনি। আমার কোনো পড়াশোনা, লেখালেখির চর্চা, কোনোটাই ছিলো না। খাঁটি এক ঢাকাইয়্যা পরিবেশ-প্রতিবেশে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও গড়ে ওঠা।
এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতি-ঐতিহ্য আভিজাত্য আমার শৈশব-কৈশোরের। তবে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন অধ্যুষিত সময়-কাল-প্রবাহ। পিতা হাজী মোহাম্মদ সামিউল্লাহর প্রগতিশীল সাহসী দেশপ্রেম- স্বাধীনতাবোধ উদ্দীপ্ত আবহ সর্বোপরি এক মহামানবের বঙ্গ জাগানিয়া চেতনা—আমাকে ঋদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূলধারায় বা অস্তিত্বের টানে আমি কলম ধরেছি। স্বপ্ন দেখেছি- জাতিসত্তার স্রষ্টা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চোখের আলোয়। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-সুকান্ত ও জসীমউদদীন আমাকে পথ দেখিয়েছেন।
সেই ১৯৬৭ সালের কোনো এক সময় দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মাহফিল’ ছোটদের পাতায় আমার ছোট্ট একটা পদ্য সিসার হরফে ছাপা হয় — আহ কী আনন্দ! ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে। সেই থেকে ছুটে চলা। জনকের আদর্শ দেশপ্রেমই আমার লেখা-লেখির প্রেরণা।
আমার নিজের কোনো প্রিয় লেখা নেই তেমন— কারণ তেমন কোনো লেখা বা একটি পঙক্তি বা দুটো ছত্রও আজ অবধি লিখতে পারিনি, হায় কেবলি শ্রম সাধনা কাটাকুটি। ভাঙা-গড়া। দু’একটি লেখা ভাবায়— যেমন রবীন্দ্রনাথ প্রিয় কবি/ লিখবে তাঁরই মতো/ আমার মাথায় ঢোকে না যে/ কাব্য কথা অতো। তাই—সুকমার রায়ের মতোই— লিখতে গেলাম ছড়া/ কলম আমার ভেঙেই গেলো/ তখন কি আর করা/ জয়নুলেরই মতোই আবার -আঁকতে গেলাম ছবি/ তুলির আঁচড়ে যাই আঁকি তাই/ এলোমেলো সবি/ সব সাধনায় ব্যর্থ হয়ে/ বুঝতে পারি আমি/ পড়ার চেয়ে জানার চেয়ে আর কিছুই নেই দামী।
স্মৃতি ছিষট্টির ছয় দফার বাঙালি জীবন করছে উদ্দীপ্ত স্বদেশ, সাতষট্টি-আটষট্টি-ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন- বাঙালির একচ্ছত্র বিজয়, সাত মার্চের জনসমুদ্র- বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার স্বাধীনতার ডাক, অহিংস অসহযোগ। দূর্বিসহ পঁচিশ মার্চ কালোরাত ন’মাসে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। হায়েনাদের গণহত্যা। রাজাকার-আলবদর, আল-শামস, আনসার, মুজাহিদ-মুসলিম লীগ-দালাল, শান্তি কমিটি-ধর্মান্ধ মৌলবাদী। আলবদর-আল-শামসের স্বাধীনতা-বিরোধী কর্মকাণ্ড। সংগঠক ও সম্পাদক শিশু-সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের এবং পুরনো ঢাকার স্মৃতি আমি ভুলতে পারি না। তাদের গৌরবের নানা দিক আমাকে ভাবায়, বাঁচায় ও কাঁদায়-হাসায়।
