শিক্ষায় ডিজিটালকরণ : ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা লিখন পদ্ধতি

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:১৮
মহাজোট সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমী ও ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের উদ্যোগে চলছে মাতৃভাষা বাংলা বর্ণমালা আদর্শিকরণের কাজ। ইতিমধ্যে প্রকল্পের অংশ হিসেবে গত ২১ ফেব্রুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নতুন ডিজিটাল ফন্ট ‘আমার বর্ণমালা’ শীর্ষক একটি বর্ণমালা জনব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেছেন—যা ভাষার মাসে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মনে বয়ে আনে আনন্দের নতুন মাত্রা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বমানের বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপর্ণ অধ্যায়। ইউনিকোড সম্পর্কে কম বেশি সকলেরই ধারণা রয়েছে বিশেষ করে যারা প্রযুক্তিগত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। কম্পিউটারে সাধারণত শুধু সংখ্যার ব্যবহার হয়। কম্পিউটারে কোনো ভাষার বর্ণ বা অক্ষর সংরক্ষিত হয় সেই বর্ণ বা অক্ষরগুলোর প্রতিটির পেছনে একটি করে একক সংখ্যা দিয়ে। বস্তুত বর্ণ বা অক্ষর সংখ্যার মাধ্যমে কম্পিউটারে প্রদর্শন ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে ইউনিকোড বলা হয়। ইউনিকোড পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার প্রতিটি অক্ষরের জন্য একটি একক সংখ্যা বরাদ্দ করে থাকে। ২০১০ সালের ২ জুলাই বাংলাদেশ ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম সংস্থার ইনস্টিটিউশনাল মেম্বার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। তখন থেকে শুরু হয় ওয়েবে বাংলার পদযাত্রা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রমিত ও ইউনিকোডভিত্তিক ‘আমার বর্ণমালা’ বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও যুক্তবর্ণের সমস্যা সমাধানের কথা থাকলেও বর্ণটি নিজেই নানাবিধ সমস্যার মধ্যে পতিত হয়েছে। গত ৫ মার্চ ‘আমার বর্ণমালা’র অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করতে গিয়ে দেখা যায় তার জ্যামিতিক চতুর্ভুজ রূপ। ছবি ও লোগো ছাড়া আর কিছুই বোঝা সম্ভবপর ছিল না। তাতে মনে হয় বর্ণমালাটি কার্যকরণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত মোস্তফা জব্বার-এর ‘আমার বর্ণমালা দুঃখিনী বর্ণমালা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে তিনি অনুরূপ আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই—পেশাদারি কাজে ব্যবহারের জন্য বিজয় বাংলা সফটওয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সফটওয়ারটির জন্য যে ফন্টগুলো যেমন— আনন্দ, সুনন্দা, সুতন্বী প্রভৃতিও জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহূত। এছাড়া অ্যাপেল কম্পিউটার, মাইক্রোসফ্ট, আইবিএম, জেরোক্স ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শতাধিক ইউনিকোড সংবলিত বাংলা ফন্ট রয়েছে। শুধুমাত্র ডিজিটাল উন্নয়নে সুনাম অর্জনের জন্য নতুন নতুন ফন্ট তৈরি করে রাষ্ট্রীয় মেধা ও অর্থ নষ্ট করার যৌক্তিকতা নেই। এটা প্রচলিত ও জনপ্রিয় ফন্টগুলোর বাইরে নতুন নতুন ফন্ট ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে একটু পেছনে গেলে যেটা চোখে পড়ে তা হলো একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি। কোনো কিছু তৈরি বা অবিষ্কার হলে সংশ্লিষ্ট মহল তখন কেবল সমালোচনাই করে এবং সেটা নিজের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করে নতুন নামে করে নতুন আবিষ্কার। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মেধা ও শ্রমকে সৃজনশীল কাজে লাগানো দরকার। সৃজনশীল নতুন আবিষ্কার বয়ে আনবে নতুন সম্ভাবনা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নে রাজনীতির মতো সহিংস ও ঈর্ষান্বিত না হয়ে মিলেমিশে কাজ করা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য ফন্ট তৈরির পাশাপাশি ইউনিকোডভিক্তিক বর্ণমালা লিখন পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অর্থাত্ আমাদের জন্য এমন একটি প্রমিত কি-বোর্ড ও বাংলা ফন্ট ইনপুট সফ্টওয়ার প্রয়োজন যা একাধারে পেশাদারি কাজ ও ইউনিকোডের সুবিধা দেবে কোনো ধরনের কনভার্টার ছাড়াই এবং এই প্রমিত কিবোর্ডে সংযুক্ত করা প্রয়োজন বাংলা একাডেমী প্রণীত বাংলা ব্যাকরণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। যেমন বাংলা বর্ণমালাতে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যে কাজ করার জন্য ইউনিকোড দরকার হয়। মূলত বাংলা ভাষার উন্নয়ন এবং তাকে বিশ্বমানের করার ক্ষেত্রে ইউনিকোড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে সকল বিষয়ে আমরা কিছুটা উন্নতি করতে পেরেছি সেসব ক্ষেত্রে আমাদের মেধা ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় না করে বরং যে সকল বিষয়ে আমরা একেবারেই পিছিয়ে আছি সে সকল বিষয়ে মনোনিবেশ করা উচিত। তবেই শিক্ষায় ডিজিটালকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাকা