গতিশীল অর্থনীতির জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প নেই

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:২৪
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। সংবিধানে বলা আছে প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র। সেখানে ন্যায্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং সুবিবেকের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে রাষ্ট্র কাঠামো। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও দেশের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি থাকবে সকলের শ্রদ্ধা। একে অপরের ধর্মকর্মে বাধা প্রদান না করে যার যার ধর্ম তাকে পালন করায় সহায়তা করবে। এতদিন শুনে আসছিলাম বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি উদার মুসলিম মডারেট কান্ট্রি, কিন্তু মাঝেমধ্যে ইদানিং খটকায় পড়ে যাই। মানুষ নিজ ধর্মের পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করতে পারছে না। ইসলাম ধর্মকে কিছু ব্লগার রুশদির মত কলংকিত করতে চায়। ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত ও লুুটেরা ভাঙচুর ও জালাও-পোড়াও করছে প্রধান প্রধান মসজিদ, মন্দির, মঠ, প্যাগোডাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়। যা মানুষকে করছে আতঙ্কগ্রস্ত। সকল ধর্মের মানুষের এখন ভয়, আতঙ্ক, নিরাপত্তা সংকটে ভুগছে। ঘরের বাহিরে মানুষের চলাফেরা কমে গেছে। পুলিশ নিরাপত্তা প্রদানের নামে কেড়ে নিচ্ছে তাজাপ্রাণ। গুলি করে হত্যাও করেছেন শতাধিক গণতন্ত্রকামী কর্মী। মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, কথা বলার বাক স্বাধীনতা বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ সর্বত্র যুদ্ধের মহড়ায় লিপ্ত হয়েছে। চালাচ্ছে গুলি আর গুলি। অরাজকতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভরা বাংলাদেশকে দেখে মনে হয় এক পুলিশী রাষ্ট্রের শাসন চলছে। পুলিশী রাষ্ট্র একজন চরম ক্ষমতাশীল রাজার হাতে রাজ্য পরিচালনার ভার ন্যস্ত করে। তাহারা দেশের শাসককে সিংহের ন্যায় শক্তিশালী ও শৃগালের ন্যায় ধূূর্ত হইবার পরামর্শ দেয়। তাই ক্ষমতাশীল শাসক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ অর্জনের জন্য নীতি-ধর্ম বিসর্জন দিয়া জনসাধারণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। পুলিশী রাষ্ট্রের ক্ষমতা এতই অশুভ যে, এর প্রভাবে মানুষ অত্যাচারী হতে বাধ্য। রাষ্ট্র হয় অত্যাচারের নিখুঁত হাতিয়ার এবং যার কার্য হয় জোর-জবরদস্তিমূলক। এরূপ রাষ্ট্রের কোষাগারও নিরাপদ থাকে না। প্রায়ই দেখা যায় ব্যাংকে ব্যাংকে লুুুুট, বিদেশে লাখ লাখ ডলার পাচার, শাখা ও বুথে আগুন। চিটাগাং এর মাজারসহ খুলনার স্বর্ণের দোকানগুলোতে কালো পোশাক পরে ডাকাতি, দেখভালের কেউ নেই। সরকার বিচার কার্য করতে যেয়ে সাক্ষ্যের ঘাটতিতে অসহায়ত্ব বরণ করে পুলিশের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কারণ হিসাবে ধরা হয়েছে, মামলার সাক্ষ্য দাতাদের মধ্যে এক এক করে সাতজনকে কে বা কারা হত্যা করেছে। এ ক্ষেত্রেও পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে। ধর্মকে তারা রাজনীতির সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। যা দ্বারা সমাজে সৃষ্ট হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। ক্ষমতা-প্রত্যাশী সরকার দেশের মানুষের উত্পাদন, বন্টন, আমদানি, রফতানি ইত্যাদি ব্যবস্থাপনায় নজর দেবার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নেই। সরকারের মন্ত্রী পরিষদের অনেক সদস্য ভুলে গেছেন ইনস্টিটিউশনাল পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনার কথা। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোন প্রতিষ্ঠান কিভাবে কাজ করছে তা জানার ইচ্ছা সরকারের নেই। না জানার এই ইচ্ছার কারণে, শেয়ার বাজার, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, এমএলএম কার্যক্রম ও মানি লন্ডারিং-এর মাধ্যমে গত চার বছরে প্রায় চার লক্ষ হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে দেশের মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির দিকে কোন রাজনৈতিক দলের সুদৃষ্টি নেই। থাকলে মানবতা বিরোধী অপরাধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেত না। এই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যেখান থেকে বাদ পড়ে নাই র্যাব, পুলিশ, আওয়ামী লীগ, বি.এন.পি, জামায়াত-শিবির, ব্লগার, হেকারসহ গ্রামের নিরীহ মানুষ পর্যন্ত। গত অর্থ বছরে অর্জিত জিডিপি ৬.৫% বৈশ্বিক মন্দার কবলে ভালই ছিল। চলতি অর্থ বছরে ৭.২% লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কোনভাবেই সম্ভবপর নয়। ঘন ঘন হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, ধর্মঘট, যানজট, বোমা, ককটেল, গুলি, ধর্ষণ, গ্রেফতার, নির্যাতন অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। বিরোধী দলের বিক্ষোভ মিছিল শেষে দলীয় কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে শতাধিক নেতাকর্মীকে। এটা যেমন অর্থনীতির জন্য শুভ নয় তেমনি গণতন্ত্রের জন্যও সুখকর নয়। সকলেই চায় রাজনৈতিক সমঝোতা। ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করে বিরোধী দলকে তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে নিতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতার নামে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা, শহীদ মিনার, জাতীয় পতাকা অথবা জাতীয় নেতাদের ছবিতেও কোন মহলের আগুন দেয়া ঠিক হবে না। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী, কম্পমান পুলিশ টিকটিকির শব্দ শুনেও ভয় পায়। এ অবস্থা বেশিদিন চলতে দেওয়া যায় না। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য রয়েছে মহান সংবিধান ও জাতীয় সংসদ। সংবিধান দেশের সব আইনের বৈধতার ভিত্তি। জনগণ চায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আসবে নির্বাচিত সরকার। একমাত্র নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারই দিতে পারে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিকে চক্রাকার গতি। লেখক :সাবেক ট্রেজারার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়