স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা সকলের দ্বারা হয় না

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৩, ২০:৫১
স্বাধীনতা মানুষের পরম আরাধ্য। ইহা তাহার জন্মগত অধিকার। তাহা সত্ত্বেও লড়াই-সংগ্রাম ও ত্যাগ ছাড়া কখনও স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার জন্য যুগে যুগে, দেশে দেশে বহু রক্ত, বহু ঘাম ঝরিয়াছে। দুনিয়ায় এমন কোনো জাতি নাই, যাহাদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিতে হয় নাই। এমন অনেক দেশও আছে, জাতীয় মুক্তির জন্য যাহাদের সংগ্রাম করিতে হইয়াছে শত শত বত্সর ধরিয়া। সহ্য করিতে হইয়াছে সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্ত দিতে হইয়াছে অজস্রধারায়। তারপরে আসিয়াছে মুক্তি। এই মুক্তি বা স্বাধীনতার মানে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, মানচিত্র ও পতাকাই শুধু নয়, নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন। যখনই কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে, তখনই সেই জাতির স্কন্ধে দায়িত্ব আসিয়া পড়ে উহার সুরক্ষা নিশ্চিত করিবার। আর সেই দায়িত্ব পালনের যে সংগ্রাম, তাহা স্বাধীনতা সংগ্রামের তুলনায় কোনো অংশেই কম নহে, বরং ক্ষেত্রবিশেষে কঠিনতর। সেই কঠিন দায়িত্ব পালন সকলের পক্ষে সম্ভবপর হইয়া উঠে না। যাহারা নিকটদর্শী, নিজের দৃষ্টিসীমার বাহিরেও যে অনেক কিছু থাকিতে পারে, তাহা যাহারা দেখিতে পান না, তাহাদের পক্ষে স্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়া বাস্তবিকই অসম্ভব। বলাবাহুল্য, আত্মকেন্দ্রিক, লোভী ও স্বার্থান্ধ লোকেরা সাধারণত দূরদর্শী হইতে পারে না। তাহারাই হইয়া থাকেন ভূত-ভবিষ্যিববেচনা রহিত। তাহারা নগদ লাভ দেখিলেই ভ্রান্তির ধূম্রজালের মধ্যে নিজেকে হারাইয়া ফেলেন। কোনো জাতির স্বাধীনতা হরণ করিতে চাহেন যাহারা, তাহাদের মিষ্টি কথায় এই শ্রেণীর লোভীরা পটিয়া যান সহজেই। স্মরণযোগ্য যে, এই দেশে ব্যবসা করিতে আসিয়াছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় বাণিজ্য করিতে আসিয়া তাহারা প্রায় অনায়াসেই পাইয়া গেল মীরজাফর আলী খা’দের। কোম্পানির ভাল ভাল কথায় লোভী মীরজাফর ও তার সহযোগীরা ক্লাইভকেই ভাবিলেন সুহূদ। চতুর ক্লাইভের সহযোগিতায় নিজেই নওয়াব হইবার আশায় মীরজাফর চক্রান্তে মাতিয়া উঠিলেন। অত:পর অস্তমিত হইল বাংলার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা হারাইলেন মীরজাফর আলী খা নিজেও। এহেন লোভী ও অপরিণামদর্শী মীরজাফর আলী খা-রা যেখানে, যে দেশে আছে, সেই দেশের স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। স্বার্থান্ধরা যখন সামনে চলিয়া আসে, যখন ইহারা সমাজ ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করিতে শুরু করে, তখনই মাথাচাড়া দিয়া ওঠে স্বেচ্ছাচারিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ হইতে মুক্তি পাইয়াছে, সে সবের অনেক দেশই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হইতে সরিয়া আসিয়াছে। সেখানে গণতন্ত্রের পথ হইয়াছে কন্টকাকীর্ণ, বৃহত্ শক্তির করদরাজ্যে পরিণত হইয়াছে অনেক দেশ। তাহাদের পতাকা ও মানচিত্র অলংকার মাত্র। আর এইরূপ ঘটিতে পারিয়াছে লোভী, আত্মকেন্দ্রিক এবং অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। যাহারা সর্বদা নিজেকে লইয়া ব্যস্ত, যাহারা মীরজাফরের ন্যায় আত্মবিক্রয় করিতে দ্বিধাহীন, তাহারা অন্যের ক্রীড়নক হইতেও দ্বিধা করেন না। তাহাদের দ্বারা জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হইবে কী প্রকারে! এই শ্রেণীর নেতৃত্ব সহজেই পরের হাতের পুতুল হইয়া যান। আর সে অবস্থায় এই ভাবিয়াই কেবল আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায় যে, যেমনি নাচাও, তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!