ক্যাপসুল খেয়ে শিশুদের অসুস্থতার খবর ছড়ানো হয় ফেসবুকে, মাইকিং করে

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৩, ২২:৫৯
ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে সারাদেশে শিশু মৃত্যুর গুজব ছড়ানো হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের একটি মসজিদের ঈমামও মাইকিং করে ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে শিশু মৃত্যুর খবর প্রচার করেন। এরপর বিষয়টি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতংক, উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে মৃত্যুর গুজবের ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম লস্করকে প্রধান করে চার সদস্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ দিকে গতকাল বুধবারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অনেক শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। অন্যদিকে, দেশের কোথাও কোথাও দেশে প্রস্তুত নকল ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, নকল এ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের কৌটার গায়ে লেখা রয়েছে ‘ম্যানুফেকচারড বাই গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, নোয়াখালী, বাংলাদেশ’। গতকাল গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া গ্রামে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অভিভাবকরা বলছেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানোর পর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে সে মারা যায়। এ শিশুটির মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি জানায়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে শিশুটির মৃত্যু হয় নি। অন্য কোন কারণে শিশুটির মৃত্যু হতে পারে। ময়না তদন্ত করা হলেই নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে বলে জানান তদন্ত কমিটির এক সদস্য। এ দিকে খুলনার ডুমুরিয়ায় দুই বছরের এক কন্যা শিশুর মৃত্যু নিয়ে অভিভাবক ও চিকিত্সকরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এ দুই শিশুর মৃত্যুর ব্যাপারে স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের কোন সম্পর্ক নেই। তবে এ ঘটনায় দু’টি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ রিপোর্ট প্রাপ্তির পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিশু মৃত্যুর ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ জানান, ক্যাপসুল খেয়ে শিশুর মৃত্যু হয়নি। নকল ক্যাপসুলের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে শুধু ভারতের অলিভ কোম্পানির তৈরি ক্যাপসুল সরবরাহ করা হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ক্যাপসুল সরবরাহের কার্যাদেশ পায়। এছাড়া অন্য কোন কোম্পানির ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করার কথা নয়। এ দিকে গুজবের ব্যাপারে গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে। এতে বলা হয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে কোন শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে নি এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব। একটি মহল সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ফেসবুকে বাশেরকেল্লা নামের একটি পেজ থেকে শিশু মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয় বলে জানা গেছে। দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া ছিল এ চক্রের উদ্দেশ্য। তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। চট্টগ্রামে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে শিশু মৃত্যুর খবর এক ঈমাম মাইকযোগে প্রচার করে। দ্রুত এ খবর ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে। ওই ঈমামকে আটক করা হয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মনোনীত সিঙ্গাপুরে একটি ল্যাবরেটরিতে দুই দফা পরীক্ষা করা হয়। এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, মানসম্পন্ন ও জীবাণুমুক্ত বলে পরে রিপোর্ট দেয়া হয়। এরপর সরকার জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন কার্যক্রমে ‘এ’ ক্যাপসুল অন্তর্ভুক্ত করে। গত মঙ্গলবার দেশব্যাপী জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন দিবসে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং দুই বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরকে কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানো হয়। ওই দিন গুজবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলায় শত শত শিশুকে অসুস্থর কথা বলে হাসপাতালে নেয়। তারা কিছুক্ষণ পর বাসায় ফিরে যায়। মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মঙ্গলবার থেকে বিষয়টি মনিটরিং করা হয়। অপপ্রচার চালানোর পেছনে ওষুধ সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এ প্রতিষ্ঠান সরবরাহে নির্বাচিত হয় নি। ক্ষিপ্ত হয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানটি অপপ্রচারে অংশগ্রহণ করেছে বলেও অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে উক্ত কর্মকর্তারা জানান। প্রেস ব্রিফিং-এ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির, স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বক্তব্য রাখেন। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমি নাশক বড়ি খেয়ে শিশুমৃত্যুর গুজবে দেশব্যাপী হাজার হাজার শিশু অসুস্থ হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে বিশিষ্ট মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গুজবে পিতা মাতা ও অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে যান। এ আতঙ্ক শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে সম্ভবত তাই হয়েছে। আতঙ্কে শিশুদের বমি ও ডায়রিয়া দেখা দেবে। বমি হবেই। এ ছাড়া শিশু প্যারালাইসড হতে পারে। তবে শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি নেই। পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের উচিত নিজেদের আতঙ্ক যেন সন্তানদের মাঝে না ছড়ায়। এ ব্যাপারে দেশের স্বনামধন্য শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, গরমের সময় কৃমিনাশক বড়ি খেলে শিশুর বমি কিংবা বমি বমি ভাব হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ্বেড়ে যাতে পারে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সামান্য পরিচর্যার পরই শিশু সুস্থ হয়ে ওঠতে পারে। বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন এবং মহাসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পূর্বে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত সিঙ্গাপুরের সর্বাধুনিক ও উন্নতমানের ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানো হয়। উক্ত পরীক্ষাগার কর্তৃক ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত, মানসম্পন্ন ও জীবাণুমুক্ত সনদ প্রদানের পরই শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। তাই শিশুদের মা-বাবাসহ অভিভাবকদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিয়ে কোনো ধরনের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। কাপাসিয়া সংবাদদাতা জানান, গতকাল বুধবার নিহত শিশুটির চাচা কবির হোসেন জানান, উপজেলার সনমানিয়া গ্রামের মনির হোসেনের দেড় বছর বয়সী শিশু কন্যা সামিয়াকে তার মা মঙ্গলবার টিকা খাওয়াতে সনমানিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ঐ দিন সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। পরে বিকালে শিশুটির জ্বর আসে। টিকা খাওয়ানোর কারণে এমন হতে পারে ধারণা করে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। রাতে ঘুমিয়ে থাকার পর সকালে শিশুটি আর নড়াচড়া না করলে তিনি গতকাল সকালে তাকে পার্শ্ববর্তী মনোহরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে শিশুটি মারা যায় নি বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। ডুমুরিয়া (খুলনা) সংবাদদাতা জানান: উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের সাহেব আলী উকিলের বাড়ীর কেন্দ্র থেকে সকালে বানিয়াখালী বাজারের আছিয়া বেগম (৪৫) তার একমাত্র শিশু কন্যা জান্নাতুল মাওয়াকে (২) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ান। দুপুর থেকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার দিকে তার মা অসুস্থ শিশুকে বানিয়াখালী বাজারের জনৈক হোমিও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে পাশের গজেন্দ্র গ্রামে এক কবিরাজের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু রাতে শিশুটি মারা যয়। সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মোর্ত্তজা শিকদার, ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাদী, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাক্তার ইয়াছিন আলী, শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শরাফাত হোসাইন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আশোক কুমার দাশসহ একটি টিম শিশুটির বাড়িতে যান এবং খোঁজ খবর নেন। তারা জানান, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে শিশুটির মৃত্যুর খবর ঠিক নয়।