‘জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি :বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা’

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ২০:০০
আলোচনা সভা জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা আয়োজনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, দৈনিক ইত্তেফাক ও ব্র্যাক স্থান: জাতীয় প্রেসক্লাব তারিখ: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সঞ্চালনা শাহীন রেজা নূর নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক স্বাগত বক্তব্য আশিস সৈকত ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও লাইন ডাইরেক্টর (সিডিসি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আলোচনায় অংশ নিয়েছেন অধ্যাপক ডা. খোন্দকার মোহাম্মদ সিফায়েতউল্লাহ মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজ ম্যালেরিয়া গবেষক ও সাবেক মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ড. মো: আকরামুল ইসলাম স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা কর্মসূচি, ব্র্যাক ডা. এম এ মান্নান বাঙ্গালী এনপিও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডা. কামরুন্নাহার সুলতানা ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডা. ওয়াসিফ আলী খান সায়েন্টিস্ট, সেন্টার ফর ভ্যাকসিন সাইন্সেস, আইসিডিডিআরবি ডা. রুবেদ আমিন সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ডা. জহিরুল করিম ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এম এন্ড পি ডি সি ডা. ইকবাল কবির সহকারী অধ্যাপক-ইপিডেমিওলোজি, নিপসম (এনআইপিএসওএম) ডা. শামসের আলী খান অ্যাডভাইজার, সাজিদা ফাউন্ডেশন জেসমিন প্রেমা নির্বাহী পরিচালক, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) আবুল খায়ের সিটি এডিটর, ইত্তেফাক ডা. শেখ সাহাবুদ্দীন আহমেদ উপ-পরিচালক-স্বাস্থ্য, চট্টগ্রাম বিভাগ ডা. হাসান ইমাম চৌধুরী সিভিল সার্জন, খাগড়াছড়ি শাহিদ উদ্দিন মাহমুদ পরিচালক ( প্রোগ্রাম ), ভিএআরডি চৌধুরী আতাউর রহমান রানা সম্পাদক, দৈনিক অরণ্য বার্তা আশিস সৈকত ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দৈনিক ইত্তেফাক আলোচনা সভার শুরুতে বৈঠকে উপস্থিত হবার জন্য সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এর আগে যক্ষ্মা নিয়ে আমরা একটি আলোচনার আয়োজন করেছিলাম। এ নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন ও পরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম। বছর জুড়ে এ বিষয়গুলো কিভাবে গণমাধ্যমে রাখা যায়। বিশেষত জনগুরুত্বপূর্ণ রোগগুলোর চিকিত্সা কোথায় গেলে পাবেন এবং কার কাছে গেলে সঠিক চিকিত্সা পাওয়া যাবে সেটি তুলে ধরার চেষ্টা থেকেই এ উদ্যোগের সাথে ইত্তেফাক যুক্ত রয়েছে। মালেরিয়া নিয়ে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম, গণমাধ্যম কী ভূমিকা রাখতে পারে সে চিন্তা থেকে যুক্ত হয়ে একসঙ্গে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আপনারা এখানে যারা এসেছেন তারা এই আলোচনার বিষয়বস্তুর বিষয়ে অভিজ্ঞ। গণমাধ্যম হিসাবে এর প্রচারণাটা আরো জোরদার করতে পারি। বছর জুড়ে এই কার্যক্রম কীভাবে করা যায় সে চেষ্টা আমরা করবো। ০০০০০০০ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও লাইন ডাইরেক্টর (সিডিসি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ম্যালেরিয়া কমে এসেছে, তারপরও দেশের দেড় কোটি লোক এখনো ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি চলছে। এর ফলে ম্যালেরিয়া বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮ সালের ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী ৮৪ হাজার ৬৯০ জন, ২০০৯ সালে ৬৩ হাজার ৮৭৩ জন, ২০১০ সালে ৫৫,৮৭৩ জন, ২০১১ সালে ৫১ হাজার ৭৯৫ জন এবং ২০১২ সালে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা কমে হয় ২৯ হাজার ৫১৮ জন। এক বছরে রোগীর সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাই এখন শুধু প্রতিরোধ নয়, সরকারের লক্ষ্য ম্যালেরিয়া নির্মূল করা। রোগীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মৃতের সংখ্যাও কমে এসেছে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়ার ফলে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুসংখ্যা কমানো সম্ভব হয়েছে। ২০০৫ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের মধ্যে মারা যায় ৫০১ জন। প্রতিবছরই মৃত্যের সংখ্যা কমছে। ২০১২ সালে এ সংখ্যা কমে এসেছে ১১ জনে। ম্যালেরিয়া বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে উঠান বৈঠক, কমিউনিটি স্বাস্থ্য শিক্ষা ফোরাম, বিসিসি এবং এডভোকেসী, গণনাটক, ফোক গান, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করা হচ্ছে। এছাড়া গোলটেবিল বৈঠক, প্রতি বছর ম্যালেরিয়া দিবস পালন, লিফলেট, পোস্টার, বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। ম্যালেরিয়ার বহনকারী মশা নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত বিশেষ ধরনের কীটনাশকযুক্ত মশারি (এলএলআইএন) সরবরাহ করা হয়েছে ৩১ লাখ ২৩ হাজার ৯০৫টি। এর মধ্যে পুরাতন হওয়ার পর বদল করা হয় ১১ লাখ ৮১ হাজার ২৭৭টি মশারি। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত জেলা হলো ১৩টি । এর মধ্যে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। ০০০০০০০ অধ্যাপক ডা. খোন্দকার মোহাম্মদ সিফায়েতউল্লাহ মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের স্বাস্থ্য খাতে অনেক অর্জন রয়েছে। সমপ্রতি একটি ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্য খাতের উপর একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করেছে, যা ৮০টির বেশি দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সূচকগুলি যে উন্নতি লাভ করেছে তা দেখানো হয়েছে। আমাদের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের প্রোগ্রাম সফলতার দিকে যাচ্ছে। এসব সাফল্য কিভাবে আসছে ? এসব সাফল্যের পেছনে সরকারের দায়বদ্ধতা, জনসচেতনতা ও গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে। জনগণের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এক্ষেত্রে মিডিয়ার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা কর্মসূচিগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। এতে জনসচেতনতা বাড়বে। এর ফলে আমাদের কর্মসূচিগুলোর সাফল্য আসবে। ০০০০০০০০ অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজ ম্যালেরিয়া গবেষক ও সাবেক মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন থেকে ১০ বছর আগে আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কাজ করতাম। ওখানে প্রতিবছর তিন থেকে সাড়ে তিনশ ম্যালেরিয়া রোগী ভর্তি হতো। এর মধ্যে মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রতি চারজনের একজন মারা যেত। এটা ২০০২ সালের ঘটনা। কিন্তু ২০১২ সালে এসে সারা দেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার। আর মৃত্যুবরণ করেছে ১১ জন। এটা সম্ভব হয়েছে কিছু কারণে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কীটনাশকে চুবানো মশারি ব্যবহার। আগে ম্যালেরিয়া রোগীকে রোগনির্ণয়ের জন্য হাসপাতালে যেতে হতো। কিন্তু এখন হাসপাতালই অনেকটা রোগীর কাছে চলে এসেছে। দেয়া হচ্ছে কার্যকরী ওষুধ। এছাড়া ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী যে গবেষণা চলছে-সেসব গবেষণাতেও বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে। আমাদেরতো মাত্র ৩০ হাজার ম্যালেরিয়া রোগী, তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? অসুবিধা হলো, যে ওষুধ দিচ্ছি তার কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমে যাবে। এখন রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে কমানো কঠিন হবে। তবে সবাইকে যদি স্বাস্থ্যজ্ঞান আমরা দিতে পারি-সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে যদি এটা আনা যায়-তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। ০০০০০ ড. মো: আকরামুল ইসলাম সহযোগী পরিচালক, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা কর্মসূচি, ব্র্যাক ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা মাঠ পর্যায় থেকেই নিতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে হবে,- এর কোন বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলো একসাথে কাজ করতে হবে। আমার মনে হয়, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে আমরা যে কর্মপরিকল্পনা করবো তাতে যেসব বিষয় টেকসই হয় এবং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি আর একটি বিষয় বলতে চাই, সেটা হলো সাংবাদিকরা পারে এই কর্মসূচির কোথায় কোন দুর্বলতা আছে তা তুলে ধরতে। এটা করা হলে, আমরা চেষ্টা করবো সেই দুর্বলতা কাটিয়ে গঠনমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে। এ ব্যাপারে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করবো। ০০০০০০০০ ডা. এম এ মান্নান বাঙ্গালী এনপিও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজ থেকে প্রায় ১১৫ বছর আগেও মানুষ ম্যালেরিয়া রোগের নাম জানতো। কিন্তু মানুষ জানতো না এটা কেন হয়, কিভাবে ছড়ায়। এই রোগের চিকিত্সা কি, মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার উপায় কি? তখন ভাবা হতো খারাপ বাতাসের কারণে এই জ্বরটা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যত লোক মারা গেল, তার চেয়ে বেশি লোক মারা গেল ম্যালেরিয়ায়। তখন টনক নড়লো বৈজ্ঞানিকদের। আর ভাগ্যক্রমে তখন ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ডিডিটি আবিষ্কৃত হলো। যেটা দেয়ালে স্প্রে করলে সব মশা মারা যায়। কিন্তু একসময়ে মশারা ডিডিটির প্রতি রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেল। ম্যালেরিয়া যদি এক প্রকার জীবাণু দ্বারা হতো তাহলে বর্তমানে যে সমস্যা হচ্ছে তার চার ভাগের এক ভাগ হতো। পৃথিবীতে ৪৩৫ রকমের এনোফিলিস মশা আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে আছে প্রায় ৩২ প্রকার। তাদের বাসস্থান একেক জায়গায়। যে মশাকে ডিডিটি দিয়ে কন্ট্রোল করা যাবে তাকে মশারি দিয়ে কন্ট্রোল করা যাবে না। যারা জুম চাষ করে তাদের জন্য ভিন্ন প্রকৃতির মশারি রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা এমনভাবে নিতে হবে যাতে, আমাদের হাতে প্রচুর অবকাঠামো, লোকবল ইত্যাদি না থাকার পরও আক্রান্তদের যথেষ্ট চিকিত্সা সেবা দেয়া যায়। আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ডাক্তার, নার্স, সেবা প্রদানকারী, এনজিও কর্মী, ভলান্টিয়ার্স, গ্রামবাসী, শিক্ষক, সাংবাদিক প্রত্যেকেই যেন কনট্রিবিউট করতে পারে, এ জন্য প্রয়োজন গণমাধ্যমের পূর্ণ সমর্থন। ০০০০০০০০ ডা. কামরুন্নাহার সুলতানা ন্যাশনাল কনসালট্যাল্ট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ম্যালেরিয়া কার্যক্রমে ১৯৬০ সালের দিকে আমরা নির্মূলের কথা চিন্তা করেছিলাম এবং সেভাবে কাজও করেছিলাম। কিন্তু তারপরে বিভিন্ন কারণে তা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আমরা আবার কন্ট্রোলে ফিরে গিয়েছি। এখন যেটা হচ্ছে আমরা কন্টো্রল থেকে আস্তে আস্তে প্রিএলিমিনেশন এবং পরে এলিমিনেশনের দিকে যাচ্ছি। এটা আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। আমাদের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ডোনারসহ সকল অংশীদারদের সাথে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে যেভাবে কাজ চলছে, তাতে তৃণমূল পর্যায়ে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে। ম্যালেরিয়া হলে কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, ম্যালেরিয়া থেকে দূরে থাকতে কি করতে হবে, কিভাবে চিকিত্সা নিতে হবে সে সম্পর্কে সবাই সচেতন হয়েছে। এই কর্মসূচি চালিয়ে যেতে পারলে একটা পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ম্যালেরিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। ০০০০০০০০ ডা. ওয়াসিফ আলী খান সায়েন্টিস্ট, সেন্টার ফর ভ্যাকসিন সাইন্সেস, আইসিডিডিআরবি আইসিডিডিআরবি গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে বান্দরবানে দুটি ইউনিয়নে কাজ করছে। সার্ভিলেন্স টিম প্রতি চার মাস পরপর গিয়ে প্রতিটি বাড়ী পর্যবেক্ষণ করছে। দেখা যাচ্ছে, ম্যালেরিয়া কমে গেছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু হটস্পট আছে যেখান থেকে ৭৫ শতাংশ ম্যালেরিয়া রোগী আসে। ম্যালেরিয়ার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। শুধুমাত্র জ্বর হলেই মানুষ ডাক্তারের কাছে যায়। আমরা ২০ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে পরীক্ষা করে দেখতে চাচ্ছি যে, জ্বর হোক না হোক তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার জীবাণু আছে কিনা। কেননা, আফ্রিকাতে এমনও দেখা গেছে, জ্বর হয় না কিন্তু ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা কম নয়। ০০০০০০০ ডা. রুবেদ আমিন সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ম্যালেরিয়া কমে এসেছে। ধারাবাহিক ম্যালেরিয়ার পরিমাণ কম পাচ্ছি। দু বছর আগে সারা দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপটা কী সেটা জানার জন্য একটি টিম কাজ করে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি বিদেশি টিমও আসে। তখন কয়েকটি সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে দেখা গিয়েছিল যে, যদিও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমেছে, কিন্তু পার্বত্য এলাকাগুলোতে ম্যালেরিয়া সে হারে কমেনি। আমরা আর একটা বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছিলাম যে, আমাদের বেশকিছু চা বাগান রয়েছে। এই চা বাগানে যে হারে ম্যালেরিয়া হয় তা আমাদের কাছে বেশ ভয়ঙ্কর মনে হয়েছিল। অনেক মানুষ কাঠকাটাসহ বিভিন্ন কাজে পার্বত্য এলাকার জংগলে যায়। সেখানে ওরা মাচায় থাকে। বিশেষ করে মাচার নিচের জায়গা খোলা থাকছে। আমরা যে মশারি ব্যবহার করছি, তা শুধুমাত্র বাড়ীতে ব্যবহারের জন্য। এসব ক্ষেত্রে এই মশারি সাফল্য পাবে কিনা? প্রসঙ্গটা কিন্তু চা বাগানের ক্ষেত্রেও আসবে। এসব ক্ষেত্রে কি কি ব্যবস্থা নেয়া যাবে তা চিন্তা করতে হবে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্র্যাকের কর্মীরা একেবারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করছে, এটা খুবই প্রশংসনীয় ব্যাপার। যে জ্বরের রোগীরা আসছে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দ্রুত শনাক্তকরণ পরীক্ষার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া শনাক্ত করা যাচ্ছে। এটা একটা চমত্কার ইমপ্রুভমেন্ট বলে আমি মনে করি। ০০০০০০০০০ ডা. জহিরুল করিম ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এম এন্ড পি ডি সি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে আমি ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে যোগ দেই। এখানে এসে ভালো লেগেছে যে, এখানে কাজের ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় খুব ভালো ছিল। পার্বত্য অঞ্চলে যেভাবে কেস কমার কথা তা কিন্তু কমেছে। ২০১১ সালে আমরা বলতে পারিনি। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে আমরা বলতে পারছি প্রায় ৪০ শতাংশ কেস কমেছে। আমাদের টার্গেট ছিল যে, ম্যালেরিয়া ২০০৮-এর তুলনায় ২০১৫ সালে ৬০ ভাগ কমিয়ে আনা। কিন্তু ২০১২তে আমরা তা অর্জন করেছি। এর ফলে স্ট্র্যাটেজিক প্লান পরিবর্তন করতে হবে। নতুন টার্গেটে আসতে হবে। আমরা তিনটি এলাকা চিহ্নিত করেছি-একটা নেত্রকোনার কলমাকান্দা, বান্দরবানের লামা এবং কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা। এই তিনটি এরিয়াতে আমাদের সর্বদা মনিটরিং চলবে। আমরা মশারিতে যে ডেল্টামেথ্রিন ব্যবহার করছি সেটা যদি মার্কেটে সহজলভ্য করি তাহলে এটি রেজিস্ট্যান্ট হবার সম্ভাবনা আছে। আমাদের দেশে পূর্বে এই মশারি মার্কেটে সহজলভ্য ছিল না। এখন যদি এই মশারি মার্কেটে উত্পাদনের অনুমতি দেই, তাহলে এটির যত্রতত্র ব্যবহার হবে। মার্কেটে উত্পাদনের আগে আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে রেজিস্ট্যান্সের মুখোমুখি হই কিনা। এছাড়া দেখা গেছে আমাদের দেশে ড্রাগ রেজিস্টেন্স এর সম্ভাবনা পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে কম। আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের দেশ কিন্তু তত ধনী নয়। আমার দেশে ফান্ড সীমিত। মিনিমাম ফান্ড ম্যাক্সিমাম আউটপুট এভাবে আমাদের কাজ করতে হবে। ০০০০০০০০ জেসমিন প্রেমা নির্বাহী পরিচালক, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) আমরা মাঠে কাজ করি। আমার আবেদন মিডিয়ার কাছে যে, আমরা যেন আমাদের কাজের সার্বক্ষণিক প্রচার পাই। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যেভাবে কাজ করছে তা বিশ্বে একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠ পর্যায়ে অনেক কষ্ট করে আমাদের কাজ করতে হয় । ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলে কর্মীরা আরো উদ্যমী হবে। আমরা চাই মিডিয়া ভালো কাজগুলো নিয়মিত তুলে ধরবে। ০০০০০০০০০ ডা. ইকবাল কবির সহকারী অধ্যাপক-ইপিডেমিওলোজি, নিপসম (এনআইপিএসওএম) আমরা কোস্টাল বেল্টে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বেসলাইন সার্ভে করেছি। আমরা আটটি কোস্টাল বেল্টে ৭৪ জন রোগী পেয়েছি । এগুলো হচ্ছে বরগুনা, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুন্ড ও কক্সবাজারের এলাকা। সমস্যা হচ্ছে, আমরা ভেক্টর সার্ভিলেন্স খুব ভালোভাবে করছি না। আফ্রিকায় যে মডেলের উপর নির্ভর করে স্ট্র্যাটেজি করেছি সেখানে এনোফিলিস মশার ২/৩ টা প্রজাতি পাওয়া গেছে। আমাদের পার্বত্য এলাকায় ২০টি প্রজাতি রয়েছে। গত ৩০ বছরে আমাদের তাপ এবং বৃষ্টির যে প্যাটার্ন এবং তার সাথে আমাদের ম্যালেরিয়ার যে প্রভাব এই দুটি পর্যালোচনা করে ধারণা করতে পারি আগামী ৩০ বছর আমাদের কী হবে। এখন আমাদের টোটাল কেস হচ্ছে ৩০ হাজার। এবং এই সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কিন্তু ভেক্টর সার্ভিলেন্স -এর পর্যাপ্ত ডাটা আমাদের হাতে নেই। এই ব্যাপারগুলো আমরা কীভাবে এড্রেস করবো, আবহাওয়া পরিবর্তনের বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি কিনা তা ভাবতে হবে। আমাদের সব সময় পর্যবেক্ষণ করতে হবে যাতে ম্যালেরিয়া কার্যক্রম আরো ভালোভাবে চলে এবং আরো ভাল ফল পাওয়া যায়। এলএলআইএনের বিষয়ে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-এফিকেসি আর একটা ইফেকটিভনেস। এই দুটিই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। বিভিন্ন কোম্পানির এই বিশেষ মশারি বাজারে এসেছে। গণহারে এর ব্যবহারের খুবই ভয়াবহ প্রভাব আছে। সাইন্টিফিক এপ্রোচ এক জিনিস আর পপুলারিটি আর এক জিনিস। রোগতাত্ত্বিক পারসপেকটিভ আমাদের মাথায় রাখা উচিত। ইফেকটিভনেস কতটা এটা নিয়ে স্টাডি হওয়া জরুরি। ০০০০০০০০০ ডা. শামসের আলী খান অ্যাডভাইজার, সাজিদা ফাউন্ডেশন ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে আমাদের কর্মসূচি ২০০৭ সালে শুরু করেছিলাম। আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেছিলাম তা কিন্তু ইতিমধ্যে পূরণ করে ফেলেছি। আক্রান্ত এলাকার ৭০ শতাংশ মানুষ এখন এলএলআইএন ব্যবহার করছে। পাশাপাশি আমরা দেখছি আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে যেভাবে আমরা জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করছি তাতে সফলতা আসবে। আরেকটা কথা, ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু অনেক কমেছে কিন্তু মারাত্মক ম্যালেরিয়া এখনো বেশি। ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় প্রত্যেকটি উপজেলাকে তৈরি করতে হবে বিশেষজ্ঞ দিয়ে। তারা যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে রোগীর কি চিকিত্সা হবে। যাতে প্রত্যেকটা কেসই জেলা পর্যায় আনতে না হয়। আরেকটা ব্যাপার, ম্যালেরিয়া নিয়ে এতগুলো অর্জন কিন্তু এসেছে গ্লোবাল ফান্ডের রাউন্ড ৬ এবং রাউন্ড ৯ এর অর্থ সহায়তায়। ভবিষ্যতের রাউন্ডগুলো নিয়েও আমাদের আরো চিন্তা করা উচিত। আমাদের কর্মসূচি ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলবে। তারপরেও ম্যালেরিয়া কার্যক্রমের সাথে, গ্লোবাল ফান্ডের সাথে কিভাবে আমরা আরো সম্পৃক্ত থাকতে পারি, ফান্ড পেতে পারি, এগুলো নিয়েই ভাবার সময় এসেছে। ০০০০০০০০০০ আবুল খায়ের সিটি এডিটর, ইত্তেফাক ম্যালেরিয়ার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে জরিপ কিভাবে, কাদের দিয়ে করাচ্ছেন তা গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, অনেক সময়ই জরিপে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। তুলে ধরা হয় না সঠিক তথ্য। দেশের প্রত্যেক জেলায় হাসপাতাল আছে, এনজিওরা কাজ করছে। তারপরও কেন ম্যালেরিয়া নির্মূল করা যাচ্ছে না সেজন্য সার্ভে করিয়ে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি নিতে হবে গঠনমূলক কার্যক্রম। এবং ম্যালেরিয়া প্রার্দুভাব এলাকায় তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে। ০০০০০০০০০০ ডা. শেখ সাহাবুদ্দীন আহমেদ উপ-পরিচালক-স্বাস্থ্য, চট্টগ্রাম বিভাগ ম্যালেরিয়ায় প্রতিটি মৃত্যুই কিন্তু আমরা রোধ করতে পারি। আমি যদি যথাসময়ে চিকিত্সা নেই, স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারস্থ হই তাহলে আমরা সহজেই ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করতে পারব। এই জায়গায় আমাদের সকলকে কাজ করতে হবে। আমরা গণমাধ্যমের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে আমরা তাদেরকে কাছে পাই। জনগণ যেন জানতে পারে, তাদের জন্য কি করা হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে যেমন সচেতনতা বাড়বে, তেমনি সহজেই বিভিন্ন সমস্যা আমরা মোকাবেলা করতে পারব। ০০০০০০০০০০০০০ ডা. হাসান ইমাম চৌধুরী সিভিল সার্জন, খাগড়াছড়ি ২০১২ সালে খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়ায় ৬ জন মারা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরা দুর্গম এলাকায় বাস করতো। যে কারণে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় তারা সময়মতো হাসপাতালে আসতে পারেনি। যার জন্য এদের মৃত্যুকে প্রতিরোধ করা যায়নি। পাহাড়ি এলাকা এবং নিচু জমিতে যারা বসবাস করে তাদের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা একটা বড় সমস্যা। যে কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা সময়মতো হাসপাতালে আসতে পারে না। তবে ইতিমধ্যে আমরা এখানকার কমিউনিটি হাসপাতালগুলোতে ম্যালেরিয়া চিকিত্সা কেন্দ্র হিসাবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এখানে কতর্ব্যরতদের ম্যালেরিয়ার উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ০০০০০০০০০০০ শাহিদ উদ্দিন মাহমুদ পরিচালক ( প্রোগ্রাম ), ভিএআরডি আমরা যে বিষয় নিয়ে কাজ করছি, তা যদি সঠিকভাবে মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে আমাদের অর্জন আরো বেশি বিস্তৃত হবে। গণমাধ্যমকে আমরা ধন্যবাদ জানাই যে, তারা আমাদের সাথে কাজ করছে। সামগ্রিকভাবে এ অর্জন দেখতে হলে আমাদের মাঠ পর্যায়ে যেতে হবে। আমরা যেসব তথ্য দিচ্ছি তার মধ্যে তেমন অসঙ্গতি নেই। ০০০০০০০০০ চৌধুরী আতাউর রহমান রানা সম্পাদক, দৈনিক অরণ্য বার্তা ম্যালেরিয়া আক্রান্ত এলাকায় যে অঞ্চলে যে ভাষা, সেখানে সে অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। পাহাড়ে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে যেভাবে কাজ করা হচ্ছে তা চালিয়ে যেতে হবে।