নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ের চেয়েও বর্তমান মহাজোট সরকারের পতনের এক দফা দাবিকেই এখন বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করানোই দলটির মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে দলের কেন্দ ীয় কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশি, ভাংচুর ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা-কর্মীকে একযোগে গ্রেফতার, জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়কে কেন্দ করে সম্প্রতি পুলিশের গুলিতে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা এবং ব্লগে ইসলাম ও মহানবীর (সা.) অবমাননা—এ চার ইস্যুতে মাঠ গরম করার মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ও বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দুটো বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত। নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য এতোদিন আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একদিনেই ৬০-৭০ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হল যে ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। এজন্য আমরা মনে করি, দেশ ও মানুষকে রক্ষা করতে হলে এখন সরকারের পদত্যাগ ছাড়া উপায় নেই। তার মতে, সরকারের উচিত এখনই নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিয়ে মেয়াদের বাকি দিনগুলোতে সহনশীল থাকা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, তারা মনে করছেন—এ চারটি ইস্যুর জন্য সরকারকে দায়ী প্রমাণ করার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হলে এতে একসঙ্গে অনেকগুলো ফল পাওয়া যাবে। তাদের মতে, চারটি ইস্যুই জনপ্রিয়। এগুলোতে একদিকে ভুক্তভোগীসহ সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীদেরও সমর্থন মিলবে। এসব ইস্যুতে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মহলগুলোরও সমর্থন থাকবে বলে তাদের দৃঢ়বিশ্বাস। এছাড়া এর মাধ্যমে ১৮ দলের অন্যতম শরিক জামায়াত ছাড়াও ইসলামী ও সমমনা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ব্লগে ইসলাম ও মহানবীর (সা.) অবমাননার ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকেও দুর্বল করা সম্ভব হবে। বিএনপি নেতারা বলছেন, অন্তত এই চারটি ইস্যুকে সামনে রেখে পদত্যাগের এক দফা দাবি জোরদার করা সম্ভব হলে সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়বে, তখন নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেয়ার বিষয়ে সরকার নমনীয় হবে।
চারটি ইস্যুতে সরকারকে চাপে ফেলতে আজ শুক্রবার থেকেই মাঠে নামছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ও মন্দিরে হামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার জন্য তিনি আজ শুক্রবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায় যাচ্ছেন। সেখানে তিনি সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্যও রাখবেন। কাল শনিবার তিনি যাবেন মানিকগঞ্জ। ইসলাম ও মহানবীর (সা.) অবমাননার প্রতিবাদে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের হরতাল চলাকালে পুলিশের গুলিতে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্ধল গ্রামে নিহত আলমগীর হোসেন, নাজিমুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন ও পাশের বলধর গ্রামের শাহ আলমের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে যাবেন খালেদা জিয়া। এসময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেবেন। জানা গেছে, মানিকগঞ্জ সফরকালে একটি পথসভা করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এছাড়া স্থানীয় চারিগ্রামে জনসভায় তার ভাষণ দেয়ারও কথা রয়েছে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি যেসব এলাকায় সংখ্যালঘুদের উপর ও মন্দিরে হামলা হয়েছে সেসব স্থানে এবং পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনাস্থলসমূহে পর্যায়ক্রমে যাবেন খালেদা জিয়া। দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, আসন্ন আন্দোলন ও আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই দলীয় প্রধানের এই ধারাবাহিক সফরের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ‘বিএনপি কিংবা জামায়াত-শিবির নয়, সরকারি দলই সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালাচ্ছে’, দেশে-বিদেশে এ রকম ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতেই খালেদা জিয়া পর্যায়ক্রমে এসব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। এছাড়া ‘বিরোধী দল দমনে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করছে’, আন্তর্জাতিক দরবারে এ রকম বার্তা পৌঁছে দেয়াও বিরোধী দলীয় নেতার এসব সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানা গেছে। সূত্র মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সংখ্যালঘুদের উপর ও মন্দিরে আক্রমণ এবং সহিংসতায় হতাহতের ঘটনাস্থলে সরকারের উল্লেখযোগ্য কেউ এখনো যাননি। এ সুযোগকেও কাজে লাগাতে চায় বিরোধী দল। ক্ষতিগ্রস্তদের সমর্থন পাওয়া ছাড়াও আগামী নির্বাচনের জন্য তা ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরি করে রাখবে।
গত ১১ মার্চ রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ ীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযান, ভাংচুর এবং একসঙ্গে ১৫৭ জন নেতা-কর্মীকে আটক, পরবর্তিতে ১৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকেও কাজে লাগাতে চাচ্ছে বিরোধী দল। এর অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বুধবার দলীয় কার্যালয় পরিদর্শন করে অনির্ধারিত সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, বিএনপির কার্যালয়ে পুলিশ যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা সরকারের বিরুদ্ধেই গেছে। কাজেই এ বিষয়টিও সামনে রেখে আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।
১১ মার্চ আটককৃত নেতা-কর্মীদের মুক্তি দেয়ার জন্য সরকারকে বেঁধে দেয়া ১৮ দলের আল্টিমেটামের সময়সীমা শেষ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। দলীয় নেতা-কর্মীরা মুক্ত না হওয়ায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৮ ও ১৯ মার্চ সারাদেশে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি পালন করবে ১৮ দল। একই দাবিতে ২১ মার্চ ঢাকা জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল করবে বিএনপি। নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের এ বিষয়কে কেন্দ করেও সরকার পতনের আন্দোলন চাঙ্গা করার কৌশল নিয়েছে দলটি। যার কারণে বর্তমান সরকারের আমলে বিএনপির দেয়া এ প্রথম ৪৮ ঘণ্টার হরতাল সর্বাত্মকভাবে পালনের জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। বুধবার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয় দেখতে গিয়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, এ হরতাল সর্বাত্মকভাবে পালন করতে হবে, প্রতিটি নেতা-কর্মীকে সেদিন রাস্তায় নামতে হবে।
এদিকে দলীয় কার্যালয়ে পুলিশি হানা ও নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে ৪৮ ঘণ্টার হরতালের সমর্থনে আগামী রবিবার সারাদেশে মহানগর ও জেলার থানায় থানায়, উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচিও দিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়ে শুরু থেকেই এক ধরনের অস্বস্তিতে ছিল বিএনপি। তবে ব্লগে ইসলাম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির বিষয়টি সামনে চলে আসায় স্বস্তি পেতে শুরু করে দলটি। যার কারণে প্রথমদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে স্বাগত জানালেও বিএনপি এখন সরাসরি এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বুধবার খালেদা জিয়া নিজেই এ মঞ্চ বন্ধ করে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি মনে করছে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন অব্যাহত থাকলে তাতে সবচে বেশি ক্ষত্রিগ্রস্ত হবে বিএনপি। কারণ এর সমান্তরালে তারা সরকার বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে খুব বেশি সুবিধা করতে পারবেন না। এমনকি তত্ত্বাবধায়কের ইস্যুও হারিয়ে যাবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং জনদৃষ্টিকে সরকারের বিপক্ষে নেয়ার লক্ষ্যেই গণজাগরণ মঞ্চের অবসান চায় বিএনপি।
জানা গেছে, সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যেই বিএনপি শাহবাগের আন্দোলনের অবসান চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে ব্লগে ইসলাম ও মহানবীর (সা.) অবমাননার প্রতিবাদকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ইত্তেফাককে বলেন, ইসলাম ও মহানবীর (সা.) অবমাননাকে মেনে নেবে না বিএনপি। এর প্রতিবাদে দেশের ওলামা-মাশায়েখসহ যারাই আন্দোলন করবে, সেখানে বিএনপিসহ ১৮ দলের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
