‘গণতন্ত্র এখন বুটের তলায়’

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৩, ২১:৫১
দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামগ্রিক সংকটের জন্য সরকারই সম্পূর্ণভাবে দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আসম হান্নান শাহ ও ড. আব্দুল মঈন খান এবং ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন, ‘রাজনীতি এখন চলে গেছে মাটির তলানিতে, আর গণতন্ত্র পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছে। জনগণকে পাশ কাটিয়ে জোর করে আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার লোভে সরকারই রাজনীতিকে এ অবস্থায় নিয়ে গেছে।’ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তারা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে পৃথক চারটি অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন। দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘স্বদেশ জাগরণ পরিষদ’ (স্বজাপ)-এর উদ্যোগে ‘জনগণের মৌলিক অধিকার ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সরকার গণতন্ত্রকে পুলিশের বুটের নিচে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রধান বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশ যেভাবে হামলা চালিয়েছে তাতে এটিই প্রমাণ হয় যে, দেশে এখন গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। সরকার মানুষকেও পুলিশের বুটের নিচে নিয়ে গেছে। কিন্তু আজ না হয় কাল দেশের মানুষ সরকারের এসব অপকর্ম চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে। তার মতে, রাজনীতি এখন মাটির নিচে চলে গেছে। এখন যা আছে তা কু-রাজনীতি, নিচুমনের রাজনীতি। শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, এ সরকার দেশের রাজনীতিকেও তলাবিহীন করে ফেলেছে। যা অত্যন্ত ভয়ংকর। ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার যদি আমাদের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চায়, তাহলে আমাদের আর কিছু করার থাকবে না। সরকার পুলিশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েম করতে চায়। সরকার রাজনৈতিক কোনো মূল্যবোধই মানছে না। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিতদের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে প্রমাণিত হয়, এ সরকারের সঙ্গে জনগণ নেই। কামরুজ্জামান সেলিমের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু ও এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘সাংবিধানিক অধিকার ফোরাম’ আয়োজিত ‘এ মুহূর্তে দরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ শীর্ষক প্রতীকী মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হান্নান শাহ বলেন, বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিচার আওয়ামী লীগেরও অনেকেই চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের বারবার নিজ এলাকায় যেতে বললেও তারা জনরোষের ভয়ে যাচ্ছেন না। কারণ এলাকার মানুষ ঝাড়ু নিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এ ভয়ে তারা এলাকায় যাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আলোচনার প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি সরকারের একটি ধোঁকাবাজি। সংলাপ নিয়ে সরকারের একেকজন একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। একজন বলেছেন, শর্ত ছাড়াই আলোচনায় আসতে হবে, আরেকজন বলছেন জামায়াতকে ছেড়ে আসতে হবে, আবার কেউ বলছেন আলোচনার দরকার নেই। কিন্তু বিএনপি স্পষ্টভাবে বলতে চায়-সংসদে তত্ত্বাবধায়ক বিল এনে তা পাসের উদ্যোগ নিলে বিএনপি আলোচনায় বসবে। আলোচনায় যাবার জন্য বিএনপি প্রস্তুত। হান্নান শাহ আরো বলেন, গণহত্যার দায়ে এ সরকারের বিচার করা হবে। বিচারের কথা শুনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার গা-জ্বালা শুরু হয়ে গেছে। বিএনপির কার্যালয়ে হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এভাবে তালা ভেঙ্গে একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাট চালিয়ে সরকার গণতন্ত্রকে পুলিশের বুটের নীচে নিয়ে গেছে। এদিকে ‘হূদয়ে বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘সরকার কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যা, গুলিবর্ষণ, গণগ্রেফতার, মামলা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আওয়ামী লীগ কখনো গণতন্ত্র বিশ্বাস করেনি, মানেনি। তারা দেশটিকে নিজেদের জমিদারি মনে করে। বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করে তারা আবার একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী গণতন্ত্র হত্যা করেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র সেনাবাহিনী হত্যা করেনি, করেছে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, ৬৩ বছর আগে আওয়ামী লীগ ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানীর কাছ থেকে ‘আওয়ামী লীগ’ শব্দটি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। দলটির সঠিক ইতিহাস জানলে তরুণ প্রজন্ম তাদের ধিক্কার দেবে। ড. মঈন বলেন, রাজনীতির এ অবস্থার জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ। সরকার জানে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এজন্য তারা তত্ত্বাবধায়ক বাদ দিয়েছে। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) মুহাম্মদ হানিফের সভাপতিত্বে এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাহ মো. আবু জাফর প্রমুখ। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে নয়াপল্টনে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, বিএনপি বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। সরকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। এজন্য আগামী জাতীয় নির্বাচনে যাতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন না করতে পারে, সেজন্য আরপিও সংশোধন করে তা বন্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী ছাড়া কোনো নির্বাচন বাংলাদেশে হতে দেয়া হবে না এবং তা মেনেও নেবে না বিএনপি। তিনি মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য অবিলম্বে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হামলার প্রতিবাদে এবং আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মিছিলটি নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিজয়নগর, পুরানা পল্টন হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়।