গাণিতিক একজনা

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ১৬:৫৬
আর সব বিষয়ের চেয়ে গণিতের প্রতিই ঝোঁক ছিল তার বেশি। গণিতে নেই কোনো ভয়! গণিত অলিম্পিয়াডের এই গানটার মতোই অংক করতেন তিনি হেসে খেলে। ডাক্তারী পড়ার শখ থাকলেও ভালোলাগার গণিত তার পিছু ছাড়ল না। নাছোড়বান্দা এই বিষয়টা তাকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর গণিত বিভাগ থেকে অনার্স আর মাস্টার্সে দুইবারই প্রথম শ্রেণীসহ মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। অসাধারণ মেধাবী এই মানুষটা প্রথমে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরপর মেধার মূল্যায়নেই সুযোগ করে নেন দেশসেরা মেধাবীদের পীঠস্থান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে। ঈর্ষণীয় সাফল্যের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া প্রজন্মের এই প্রতিনিধির নাম ইশরাত জাহান। শুধুই গণিতের ছকবাঁধা নিয়ম নয়, তিনি কথা বলেছেন নানা বিষয়ে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র মাথার দুই পাশে বেণী করা মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে দুলতে দুলতে বাবার কাছে হাজির। ফলাফল দেওয়া হয়েছে আজ। বাবা হাতে রেজাল্ট কার্ড নিয়ে অবাক হয়ে অংকের ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শ্রেণীতে সর্বোচ্চ মান, প্রাপ্ত মান আর পূর্ণমান একই এবং সেটা একশ। শৈশবে অংকে একশতে একশ পাওয়া নিয়ে তার প্রতিযোগিতা চলত ভাইয়ার সাথে। মজার বিষয় শুধু স্কুল-কলেজেই নয়, এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষাতেও গণিতে তার নম্বর শুনলে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়—একশ থেকে এক কম। সেটাও বুঝি দিতেই পারতেন শিক্ষক! বেচারীর রেকর্ডটা অটুট থাকত! সেই মেয়েটাই আজ দেশের সেরা মেধাবীদের গণিত শেখান। শুনছিলেন ইশরাত জাহানের শৈশবের কথা, খুব শান্ত প্রকৃতির ছিলেন সে সময়। নকশীকাঁথার শহর জামালপুরের মেয়ে ইশরাত জাহান কাছের মানুষদের কাছে ববি নামেই পরিচিত। প্রজন্মের এই প্রতিনিধির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, গণিতের মতো খটমট বিষয়টাকে আপন করে নিলেন কীভাবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘কখনোই গণিতকে তার আছে খটমট মনে হয়নি, অন্তত তিনি মনে করেননি। ছোটবেলা থেকেই যদি আগ্রহ থেকে করা হয়, যে কেউ ভালো করবে নির্দ্বিধায়! অংক অনেকেই না বুঝে মুখস্থ করে, যেটা মোটেও কাম্য নয়। কারণ, গণিত পরীক্ষাতে পাস করার বিষয় নয় মাত্র, গণিতের প্রয়োগ জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে।’ শিক্ষকতাকে মেয়েরা পেশা হিসেবে আগ্রহ করেই নেয়, কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়? ইশরাত জাহান মনে করেন, ‘এই চিন্তাটাই আসা উচিত না আমি পারব না, আমার অমুক প্রতিবন্ধকতা আছে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন ছেলেকে টপকেই তার অবস্থান, এমনটা মনে করলেই মানসিক সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।’ আর তিনি সব সময় সবকিছু সময় মেনে করতে চেয়েছেন। অনেক কিছুই আমরা একত্রে করতে পারি, শুধু সময়টা সমন্বয় করে নিতে পারলেই হলো। এ জন্য নিজেকে খুব দায়িত্ব সচেতন হতে হবে বলে মনে করেন ইশরাত। বর্তমানে কাজের পরিবেশটা কেমন লাগে জানতে চাইলে বললেন, ‘সব শিক্ষার্থীর মনেই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার একটা ইচ্ছে কাজ করে।’ তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বুয়েটে শিক্ষকতা করতে আসার পর মনে হয়েছে, শিক্ষকতার যথেষ্ট ভালো সুযোগ রয়েছে এখানে। তাই ইশরাত জাহানের স্বাছন্দ্যের মাত্রাটা শতভাগ সব দিক দিয়ে। একজন শিক্ষকের কী কী গুণ থাকা উচিত বলে মনে করেন? উত্তরে তিনি জানান, তাদের সময়ে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের একটা দূরত্ব থাকত, জড়তা কাজ করত। এখন সেই সময়টা আর নেই। শিক্ষার্থীরা যেকোনো বিষয় নিয়ে আসতে পারছে শিক্ষকের কাছে, সেগুলো নিয়ে মুক্ত আলোচনাও করতে পারছে। বন্ধুত্বের এই যে সম্পর্ক, এটা পড়াশোনার মানেরও উন্নয়ন ঘটাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। বাংলদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের এই শিক্ষকের শৈশব-কৈশোর কেটেছে জামালপুরেই। বাড়ির পাশেই স্কুল ছিল। বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর বাকিটা সময় বাসায়। এই ছিল তার জগত্। খুব যে পড়াশোনা করতেন তেমনটা নয়, তবে যেটুকু করতেন সেটা নিখাদ হওয়া চাই। বাবা-মা দুজনই জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা, কিছুদিন হলো বাবা অবসরে রয়েছেন। পরিবারের ছোট মেয়ে বলেই ববির শৈশব-কৈশোর কেটেছে তাই আনন্দের মাঝেই, সবার ভালোবাসা পেয়ে পেয়েই কেটে গেছে তার সেই দিনগুলো। একমাত্র ভাই রাফি উদ দৌলা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে ঢাকার যাত্রাবাড়িতে স্বামী আক্তারুজ্জামান লিকুর সাথে রচিত হচ্ছে ইশরাত জাহানের সুখের দিনলিপি। আক্তারুজ্জামান লিকু পেশায় চিকিত্সক, কর্মরত রয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নানা ব্যস্ততার মাঝে ইশরাত জাহানের একটাই চাওয়া, যেটুকু জানেন, সেটা শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া, এর প্রয়োজনে যতটা উচ্চশিক্ষা নেওয়ার, সবটাই তিনি নেবেন। ইশরাত জাহান ডাকনাম :ববি মায়ের নাম :রাফিদা বিনতে রহমান বাবার নাম :মো. ইতমত উদ দৌলা জন্মতারিখ ও স্থান :২১ মার্চ, জামালপুর প্রিয় পোশাক :শাড়ি প্রিয় উক্তি :ডু অর ডাই প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রথম স্কুল :জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, টিভি দেখে, ভ্রমণে সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম আর একাগ্রতা দিয়ে কাজ করলে সফলতা আসবেই।