সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ২১:৪৪

শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলা

এম এ আল আমিন

 

ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কায় ২১ এপ্রিল ভয়াবহ বোমা হামলায় মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৩শ এবং আহতের সংখ্যা ৫শ ছাড়িয়েছে। দিনটি ছিল ইস্টার সানডে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উত্সবের দিন। হামলা রোধে কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৩০ দিনের জন্য জরুরি আইন জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। নিষিদ্ধ করা হয়েছে মুসলিম নারীদের জন্য বোরকা। প্রশ্ন উঠেছে এসব পদক্ষেপ ভীতিকর পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করবে নাকি আরো জটিল করে তুলবে।

জরুরি অবস্থা জারি করায় শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক জনতার ওপর ব্যাপক ক্ষমতা পেয়েছে। ১৯৭০ এর দশকে প্রণীত সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইন প্রয়োগের সুযোগ পেল দেশটির সামরিক বাহিনী। যে মাত্রায় হামলা হয়েছে তারপর এসব পদক্ষেপ অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় কাউন্টারিং ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম (সি ভি ই) এর বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ নতুন কিছু নয়। তবে অভিজ্ঞতা বলে এর ফলে অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে ওঠে। সি ভি ই নীতিটি ৯/১১ হামলা পরবর্তী সময়ে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত হয়। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তিন দশকের গৃহযুদ্ধ অবসানে এর মাত্রা ছাড়া প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহিন্দ রাজাপাকসে। রাজাপাকসের নির্দেশে নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। রাজাপাকসের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধাপরাধেরও অভিযোগ আনে। ২০০৯ সালের ১৮ মে তামিল নেতা প্রভাকরণ নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহের অবসান ঘটে। অনেকে মনে করেন চলতি বছর শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসের ক্ষমতায় ফিরতে পারেন। কারণ তামিল বিদ্রোহীদের দমনে তিনি যেমন সফল হয়েছেন তেমনি মুসলিম চরমপন্থিদের দমনেও তিনি সাফল্যের পরিচয় দেবেন।

হামলার নেপথ্যে কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এন টি জে ) নামে একটি অখ্যাত চরমপন্থি গ্রুপকে দায়ী করা হয়েছে। ঘটনার দুদিন পর জঙ্গি গ্রুপ ইসলামিক স্টেট (্আইএস) ঘটনার দায় স্বীকার করে। প্রশ্ন উঠেছে যারাই দায়ী থাকুক এটি প্রতিরোধ করা কি যেত না?

এটি স্পষ্ট যে কর্তৃপক্ষের হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো যথেষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল। কিন্তু তারা যে কোনো কারণেই হোক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে মার্কিন ও ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। এর এক সপ্তাহ পর শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সম্ভাব্য হামলাকারী তার একটি সে বিষয়ে পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করতে বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা হয় নাই। এনটিজে হামলা চালাতে পারে, দেশটির মুসলিম কমিউনিটির পক্ষ থেকেই এমন সতর্কবার্তা  পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেলকে দেওয়া হয়েছিল। ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেলের পক্ষ থেকে মেমোটি মন্ত্রিপরিষদ নিরাপত্তা বিভাগ, জুডিশিয়াল নিরাপত্তা বিভাগ ও কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। মুসলিম কাউন্সিল অব শ্রীলঙ্কার সহসভাপতি বছর তিনেক আগে সামরিক গোয়েন্দাদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এতসব আগাম সতর্কতার পরও কাজের কাজ কিছু হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় দ্বিধাবিভক্ত। প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী অনেকদিন ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত আছেন। দুজনার দ্বন্দ্বের জেরে দেশটি গত বছর শেষের দিকে সাংবিধানিক সংকটে পড়ে। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসেকে বসিয়েছিলেন। রাজনৈতিক এই অভ্যুত্থান অবশ্য সফল হয়নি। বিক্রমাসিংহে শেষ পর্যন্ত নিজের পদে ফেরত এসেছেন। সে ঘটনার জের এখনো কাটেনি।