বদলে যেতে পারে হিসাব-নিকাশ

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ২১:৪৪

ভারতের লোকসভা নির্বাচন

তালেব রানা

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে চার ধাপের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। মোট সাত ধাপের ভোটগ্রহণ শেষ হবে আগামী ১৯ মে। ২৩ মে ভোট গণনা হবে আর সেদিনই জানা যাবে কারা বসছেন দিল্লির সিংহাসনে। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভালো অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব জরিপগুলো বলছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবারের নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেতে পারে। আবার কিছু জরিপ বলছে, হয়তো সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে পড়তে পারে এই জোট। আর এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদি অন্য যে কোনো দলের নেতার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

তবে কি জরিপের ফলই ঠিক হবে? অনেকে বলছেন, এবারের নির্বাচনে ২০১৪ সালের মতো মোদি জোয়ার নেই। আর ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নীরবতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ২০০৪ সালের নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল। তখনকার জরিপগুলো বলছিলো, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট জিতবে। কংগ্রেস ছিলো আলোচনার বাইরে। কিন্তু ওই নির্বাচনে তাক লাগিয়ে জয় পেয়েছিলো কংগ্রেস জোট। তাই জরিপের ফলাফলকে এখনই সঠিক বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

এর পেছনে আরো কিছু কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) এক নিবন্ধে এ বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। লেখক রশিদ কিদওয়াই বলেছেন, এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাক্টর’ রয়েছে। এর মধ্যে একটি ফ্যাক্টর হতে পারে মুসলিমদের ভোটের ধরণও।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনেও সামনে থেকে এনডিএ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। কিন্তু ভোটারদের দোদুল্যমানতা, পশ্চিমবঙ্গ, তামিল নাড়ু, কেরালা, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রের মতো রাজ্যে শক্তিশালী বিজেপি নেতার অভাব, বর্তমান সরকার বিরোধী মোনভাব এই নির্বাচনকে আরো উত্তেজনাকর করে তুলছে। পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলার পর জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে মোদির কঠোর অবস্থান ও তার ‘ক্লিন ইমেজ’ দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে। এটা হলো অনেকগুলো সম্ভাবনার একটি। কিন্তু এবারের নির্বাচন যদি হয়, নরেন্দ্র মোদি বনাম অঙ্কের এবং সেখানে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে জাত-পাত, স্থানীয় ইস্যু, ভোটারদের ওপর আঞ্চলিক দল ও জোটের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা হয়, সেক্ষেত্রে ২৩ মে’র ফলাফল কিছুটা চমকপ্রদ হতে পারে।

এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর উত্তর প্রদেশ। এই রাজ্যের ৮০ আসনেই নির্ধারণ হবে পরবর্তী সরকার কারা গড়বে। মোদির জনপ্রিয়তা থাকলেও কট্টর জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা ইস্যুর বিচারে ভালো অবস্থানে নেই বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিভিন্ন বক্তব্যও বিজেপিকে বেকায়দায় ফেলছে। অন্যদিকে জাত-পাতের হিসেবে বিরোধীরা ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিছুদিন আগেই দেওবন্ধে এক সমাবেশে জড়ো হয়েছিল জাট, যাদব, দলিত ও মুসলিমরা। শুধু উত্তর প্রদেশেই দলিত-মুসলিমরা এক হচ্ছে তা নয়। এই রাজ্যের বাইরেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

নির্বাচনী জরিপগুলোতে একটি বিষয় বাদ পড়েছে, তা হলো মুসলিমদের নীরবতা। মুসলিম নেতারা এবারের নির্বাচনের আগে কোনো দলের পক্ষে ফতোয়া দেননি। আবার মুসলিম প্রতিনিধিদেরও তেমন কোনো বক্তব্য সামনে আসেনি। ভারতের মুসলিম ও বিজেপির সম্পর্কের ক্ষেত্রটা জটিল এবং পারস্পারিক আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এই মুসলিম ভোটাররা এবারের নির্বাচনে বিজেপির জন্য একটি ফ্যাক্টর হতে পারে।

উত্তর প্রদেশের ‘আউট স্পোকেন’ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ উল্টা-পাল্টা মন্তব্য করে শুধু নির্বাচনী প্রচারণা থেকে নিষিদ্ধ হচ্ছেন তা নয়, বিজেপির জন্য মুসলিমদের ভোট পাওয়ার সুযোগও কমছে। আমাদের আছে বজরং বলী, তাদের আছে হযরত আলী বা গ্রিন ভাইরাসের মতো মন্তব্য করে তিনি মুসলিমদের অনেকের মধ্যে বিজেপি বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছেন।

উত্তর প্রদেশের সরকারের থাকা সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি সম্প্রতি জোট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই জোটের লক্ষ্য অর্জিত হলে উত্তর প্রদেশে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হবে বিজেপিকে। গত নির্বাচনে বিজেপি জোট ৮০ টির মধ্যে ৭০টির বেশি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবার সেখানে ৩৫ থেকে ৪০ আসন কমে গেলে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম বা অন্য রাজ্য থেকে তা পূরণ করতে পারবে না বিজেপি।

দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটক ছাড়া অন্য কোনো রাজ্যে শক্ত অবস্থান নেই বিজেপির। তামিল নাড়ুতে বিজেপি জোটের চেয়ে কংগ্রেস জোট জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে। এই রাজ্যে জনপ্রিয়তায় রাহুলের চেয়ে পিছিয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদি। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, কেরালা, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানাতেও মোদি আঞ্চলিক নেতাদের চেয়ে জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে আছেন। উত্তর প্রদেশের বাইরে এসব রাজ্যে বিজেপির ভালো করার সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে প্রথমবারের মতো গান্ধী পরিবারের তিনজন সদস্য কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা যদি এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসকে ১০০ ‘প্লাস’ আসন এনে দিতে না পারেন, আর বিজেপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে কংগ্রেস থেকে গান্ধী পরিবারের বিচ্যুতি শুরু হয়ে যাবে। এই বিচ্যুতি ধারণার চেয়ে দ্রুতই হবে।