বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বিদলীয় বিভাজন যত পষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে অস্থিতিশীলতার ভয় এবং অরাজকতার আতঙ্ক ততো গভীরভাবে দানা বাধছে। দেশে রাজনীতির দুই ধারার অনুসারিদের মধ্যে হানাহানির বিষবাষ্প যেভাবে ফেনিয়ে উঠছে তাতে মানুষের মন থেকে স্বস্তি সম্পূর্ণ উবে গেছে। জাতির জীবনে শান্তি নিশ্চিত করে মানুষের জীবন-জীবিকা স্বচ্ছন্দ করে দেয়ার দায়িত্ব যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সেই রাজনীতিবিদেরা নিজেরাই জাতির জন্য উদ্বেগ উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সাধারণ মানুষের চোখে মুখে শংকা এবং আতংক পষ্ট ফুটে উঠতে শুরু করেছে। দেশে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ধসে পড়লেও রাজনীতিবিদেরা মানুষের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বুঝতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না।
রাজনীতির অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং মিলেমিশের সংস্কৃতি দেখার সৌভাগ্য এদেশের মানুষের আজও হয়নি। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে ঔপনিবেশিক আমল থেকে রাজনীতির অঙ্গনে বিরামহীন হানাহানি চলছে বললে ভুল বলা হয় না। প্রায় এক শতাব্দী ধরে পুরুষানুক্রমে মারপিটের রাজনীতি দেখার পরেও আমরা সাধারণ মানুষ হানাহানির রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। আমরা এখনও আইনসিদ্ধ রুজি-রোজগার এবং শালীন শোভন জীবন-যাপনের স্বপ্ন দেখি। আর সে কারণে আমরা শান্তির প্রত্যাশায় দিনগুনি। কিন্তু ২০১৩ সালেও দেশের রাজনীতিতে দ্বিদলীয় যুদ্ধংদেহী চেহারা দেখে শান্তির প্রত্যাশা বাতাসে মিলিয়ে যেতে বসেছে। রাজনীতিবিদদের সহিংস হুংকারে আতংকিত মানুষ ভাবছে, ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।’ আসছে দিনগুলো বাংলাদেশের মানুষের জন্য না জানি কেমন বিভীষিকায় ভরা।
ইদানিং মনে হয় জাতি হিসাবে আমরা বিদ্বেষপূর্ণ দ্বিদলীয় রাজনীতির দুষ্ট আবর্তে স্থায়ীভাবে আটকে গেছি। বাংলাদেশে রাজনীতিতে দ্বিদলীয় বিভাজনের ভয়ংকর রূপ দেখে সাতচল্লিশপূর্ব ভারতবর্ষের রাজনীতিতে দ্বিদলীয়, দ্বিজাতি বিভাজনের কথা স্মরণ করতে হয়। তিরিশের দশকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বললেন, ভারতের হিন্দু এবং মুসলমান দুই জাত। এমন স্বতন্ত্র দুই জাত কখনো এক দেশে এক সরকারের ছাতার তলে শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। অতএব আমাদের দুই জাতের জন্য দুইটা স্বতন্ত্র দেশ প্রয়োজন। গুজরাটী ব্যারিস্টার মি: জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ঋণ ভারতের হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায় ’৪৬-’৪৭ সালে এক সাগর রক্ত দিয়ে শোধ করেছে। স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠির সাথে ভারতীয়দের যদি যুদ্ধ হতো এবং যুদ্ধে লক্ষ কোটি মানুষ শহীদ হতো তাহলে সেই রক্তস্রোতের জন্য আমরা গর্ব করতে পারতাম। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার বেদিমূলে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির যে রক্ত অর্ঘ্য ঢেলে দেয়া হয়েছে তাতে জাতি হিসাবে লজ্জা না পেয়ে আমাদের উপায় নেই। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে মিঃ জিন্নাহ্র দ্বিজাতি তত্ত্বের ভূত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বিদলীয় বিভাজন তত্ত্বে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, আমরা পুরুষানুক্রমে বিদ্বেষের চক্রে আটকে গেছি। বুকের মধ্যে বিদ্বেষের বিষ জমাট বেঁধে আছে। সুযোগ পেলেই সেটি ফুঁসে উঠে আমাদের সমাজের গায়ে ধর্ম কিংবা মতদ্বৈততার অজুহাতে বিষাক্ত ছোবল মারছে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশ জন্ম নেয়ার পরে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে আর একটি দেশ বাংলাদেশের জন্ম। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ তিন দেশের মধ্যে তুলনামূলক পরিস্থিতি বিচারে ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঈর্ষণীয়। জন্মের পর থেকে ভারতে একদিনের জন্য গণতন্ত্র চর্চায় ছেদ পড়েনি। অবিরাম গণতন্ত্র চর্চা করে দেশটি যথেষ্ট ভালো অবস্থায় আছে। বিরামহীন গণতন্ত্র চর্চা ভারতের বর্তমান ঐশ্বর্যের উত্স। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের চিত্র ভারতের ঠিক বিপরীত। জন্মের পর থেকে দেশ দুটিতে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ উভয় দেশে সেনাবাহিনী তার পেশাদারী দায়িত্বের বাইরে এসে দেশের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় এই দুটি দেশে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের যেমন হানি হয়েছে তেমনি দেশের অগ্রগতি বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সেনাবাহিনী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে সমস্যার গভীরে না গিয়ে ভাসা-ভাসা বিচারে তাত্ক্ষণিক সেনাবাহিনীকে দায়ী করা চলে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের দায় দ্বিদলে বিভাজিত রাজনীতিবিদদের ঘাড় থেকে সরানো খুব কঠিন। প্রকৃত অর্থে পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতিবিদেরা দায়িত্বজ্ঞানহীন, অসহিষ্ণু, বালখিল্য আচরণ করে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় আসার পথ করে দিয়েছেন। কখনো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কখনো ক্ষমতা আঁঁকড়ে ধরে রাখার জন্য রাজনীতিবিদেরা উগ্র দলাদলির আশ্রয় নিতে পিছপা হননি। রাজনীতিবিদদের নিজেদের মধ্যে ফেনিয়ে উঠা সংঘাত প্রতিবার সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। রাজনীতিবিদেরা আত্মসমালোচনার ধারে কাছে না গিয়ে আত্মতুষ্টির জন্য বলে থাকেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসার জন্য ষড়যন্ত্র করে থাকে এবং ষড়যন্ত্র সফল হলে তারা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় চড়ে বসে। কিন্তু রাজনীতিবিদদের মধ্যে যদি আত্মসমালোচনার উদার মানসিকতা থাকত তাহলে তারা দেখতে পেতেন এদেশে প্রতিবার সেনা শাসন আসার মূলে রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শী হানাহানি দায়ী। তারা নিজেদের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে জানেন না বলে ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দুটো থেকেই চোখ ফিরিয়ে রাখেন।
বর্তমানে সরকার এবং বিরোধী দল সম্মিলিত চেষ্টায় দেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে নিত্যদিনে খেটে খাওয়া মানুষ এবং ব্যবসায়িরা এখন চোখে আঁঁধার দেখছেন। দেশের বেহাল অবস্থার গতিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা এমনও বলছেন যে, তারা আর রাজনীতিবিদদের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। ব্যবসায়ী হিসাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তারা বিকল্প পথের সন্ধান করছেন। তারা ভেবে-চিন্তে কি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারবেন তার রূপরেখা না জেনে আগাম মন্তব্য করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, সমস্যা নিরসনের জন্য ব্যবসায়ীরা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না কেন সেটি অবশ্যই সাময়িক। দেশের মানুষ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনীতিবিদদের মুখের দিকেই চেয়ে আছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে আমরা পুনরায় তিক্ত একটি পরিণতির দিকে পায়ে-পায়ে এগিয়ে চলেছি। আত্মসমালোচনায় অনভ্যস্ত রাজনীতিবিদেরা দেশে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলে তার দায় অন্যের কাঁধে চাপানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী উভয় দল মাত্র কয় বছর আগের তিক্ত ভোগান্তির স্মৃতি বর্তমান সময়ে ভুলেও স্মরণ করছেন না। গতবার নির্বাচনকে ঘিরে ঘনিয়ে উঠা রাজনৈতিক সমস্যা রাজনীতিবিদেরা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সমাধান করার উদ্যোগ নেন নাই। সমস্যা সমাধানের জন্য সে সময় তারা কেউ লগি বৈঠা হাতে তুলে নিয়েছিলেন আবার আরেক দল ভেবেছিলেন আমাদের সাজানো মঞ্চে আমাদের মর্জি-মাফিক পর্দা উঠবে-পর্দা পড়বে। আদতে তাদের উভয় দলের মর্জি-মাফিক দেশে কিছুই ঘটেনি। সেদিন যা ঘটেছে সেই স্মৃতি জনগণের মনে আছে। শুধু রাজনীতিবিদেরা সব ভুলে বসে আছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এদেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে ভুগছেন। আমাদের রাজনীতিবিদেরা যখন জেলে বাস করেন তখন তারা তাদের অলস অবসরে কি কথা ভাবেন সেটা তারা নিজেরা ভালো বলতে পারবেন। তবে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মুক্ত আলো হাওয়ায় এসে তারা গঠনমূলক কিছু ভাবতে পারেন বলে জনগণের জন্য বিশ্বাস করা কঠিন। তাদের কথা এবং কাজ দেখে মনে হয় তারা অন্য দলের সাথে সংঘাত সৃষ্টির চিন্তায় নিরলস। সংঘাত এবং বিদ্বেষকেই তারা রাজনীতি বলে বরণ করে নিয়েছেন।
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা পানি ঘোলা করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে পানি এবার অতিমাত্রায় ঘোলা হয়ে গেছে যেখানে তারা নিজেরাও পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এমন ভয়ঙ্কর ঘোলা পানিতে কে শিকার আর কে শিকারি সে কথা বোঝা ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে। তাদের জল ঘোলা করার প্রতিযোগিতা দেখে অনেক আগে জনজীবনে স্বস্তি লোপ পেয়ে এখন আতংক চরমে পৌঁছেছে। আমরা নিশ্চিত নই, রাজনীতিবিদেরা আমাদের শংকা উত্কণ্ঠা কবে বোঝার চেষ্টা করবেন। কিংবা আদপে কোনদিন করবেন কি না। শান্তিপ্রিয় দেশবাসী ভাবছে, আমাদের রাজনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা ভুলে পক্ষে-বিপক্ষের লাশ গোনার নিষ্ঠুর খেলায় মজে আছেন। রাজনীতিবিদেরা যেন তাজা গ্রেনেডের পিন নিয়ে খেলতে বসেছেন। আমরা সত্যি আতঙ্কিত।
আমরা, দেশের সাধারণ মানুষ এখনও আশায় বুক বেধে আছি। আমরা বিশ্বাস করতে চাই রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা সকল পক্ষ খোলা মন নিয়ে আলোচনা করে সংকট উত্তররে পথ খুঁজে বের করবেন। আমরা আরও আশা করতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা রাজনীতির অভিধানে পরমতসহিষ্ণুতা শব্দটি খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে পাবেন।
লেখক : কথাশিল্পী
